মে ২৯, ২০১৭ ১৬:৪৯ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আনকাবুতের ৪৬ থেকে ৪৯ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৪৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَلَا تُجَادِلُوا أَهْلَ الْكِتَابِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِلَّا الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْهُمْ وَقُولُوا آَمَنَّا بِالَّذِي أُنْزِلَ إِلَيْنَا وَأُنْزِلَ إِلَيْكُمْ وَإِلَهُنَا وَإِلَهُكُمْ وَاحِدٌ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ (46)

"এবং তোমরা আহলে-কিতাবদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক করবে, কিন্তু সৌজন্যের সঙ্গে- তবে তাদের সঙ্গে নয় ওদের মধ্যে যারা সীমালঙ্ঘনকারী; এবং (তাদেরকে) বলো- আমাদের প্রতি ও তোমাদের প্রতি যা অবর্তীর্ণ হয়েছে, তাতে আমরা বিশ্বাস করি এবং আমাদের উপাস্য ও তোমাদের উপাস্য তো একই। এবং আমরা তারই প্রতি আত্মসমর্পণকারী। (২৯:৪৬)

এর আগের কয়েকটি আয়াতে মহান আল্লাহকে অস্বীকারকারী কাফির ও মুশরিকদের সঙ্গে মুসলমানদের আলোচনার পদ্ধতি বাতলে দেয়া হয়েছে। আর আজকের এ আয়াতে আহলে-কিতাব অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সঙ্গে মুসলমানরা কীভাবে কথা বলবে সে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। প্রথমে এ সংক্রান্ত একটি সার্বিক নিয়ম উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: আহলে-কিতাবদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাদের প্রতি সম্মান দেখাতে এবং অত্যন্ত নম্র ও ভদ্র ভাষায় কথা বলতে হবে। যুক্তিপূর্ণ ভাষা প্রয়োগ করার পাশাপাশি অহংকার পরিহার করতে হবে। এই পন্থা অনুসরণ করলে তোমাদের কথা তাদের অন্তরে দাগ কাটবে এবং যারা সত্য অনুসন্ধানী তারা ইসলাম গ্রহণ করবে।

অবশ্য যারা ভদ্র ভাষায় এবং পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে কথা বলে না তাদের ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য নয়। যারা তোমাদেরকে সম্মান দিয়ে কথা বলে না  এবং দম্ভ ও অহংকার করে- তাদের সঙ্গে নম্র ভাষায় কথা বলে নিজেদেরকে ছোট ও মর্যাদাহীন করার প্রয়োজন নেই।

আয়াতের পরবর্তী অংশে ঐশী ধর্মগুলোর অভিন্ন বিষয়গুলোর গুরুত্ব তুলে ধরে বলা হয়েছে: আলোচনার শুরুতেই বিতর্কিত বিষয়গুলো উত্থাপন করো না বরং ঐশী ধর্মগুলোর অভিন্ন বিষয়গুলো দিয়ে আলোচনা শুরু করো। তাদেরকে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার এবং তার নির্দেশাবলীর কাছে আত্মসমর্পন করার আহ্বান জানাও।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. অমুসলিমদের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে কটুকথা ও অপমানজনক আচরণ পরিহার করতে হবে। আলোচনা হতে হবে যুক্তিপূর্ণ ভাষায় তাদের বিশ্বাসে সংশোধন আনার লক্ষ্যে। এ ছাড়া, মুসলমানদের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রেও এই নীতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে।

২. বিভিন্ন ঐশী ধর্মের অনুসারীদের সঙ্গে পরস্পরের অভিন্ন বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা ও মতবিনিময় করতে ইসলামে বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

৩. শুধুমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনাই যথেষ্ট নয় বরং তাদের নির্দেশগুলিও অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে।

সূরা আনকাবুতের ৪৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَكَذَلِكَ أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ فَالَّذِينَ آَتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يُؤْمِنُونَ بِهِ وَمِنْ هَؤُلَاءِ مَنْ يُؤْمِنُ بِهِ وَمَا يَجْحَدُ بِآَيَاتِنَا إِلَّا الْكَافِرُونَ (47)   

"এইভাবে আমি তোমার প্রতি কোরআন অবতীর্ণ করেছি এবং যাদের আমি কিতাব দিয়েছিলাম, তারা এতে বিশ্বস করে এবং এদেরও (অর্থাৎ মুশরিকদেরও) কেউ কেউ এতে বিশ্বাস করে। অবিশ্বাসীরা ছাড়া আর কেউ আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করে না।" (২৯:৪৭)

হযরত মূসা ও হযরত ঈসার প্রতি যেমন তাওরাত ও ইঞ্জিল নাজিল হয়েছে তেমনি বিশ্বনবী (সা.)’র প্রতি নাজিল হয়েছে পবিত্র কুরআন। আর এই সব কিতাবের উৎস হচ্ছে মহান আল্লাহর বাণী। কাজেই এগুলোর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। মুসলমানরা যেমন অতীতের নবী-রাসূলদের কিতাবে বিশ্বাস করে তেমনি আহলে কিতাবেরও উচিত শেষ নবী ও তার প্রতি নাজিল হওয়া কিতাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা।  কারণ, কুরআনে যেসব শিক্ষণীয় বিষয় এসেছে একইরকম শিক্ষণীয় বিষয় ছিল অতীতের ঐশী কিতাবগুলিতে।

আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে: আহলে কিতাবের পাশাপাশি মুশরিক ও মূর্তি পূজারিদের মধ্যে যারা সত্যকে পেতে চায় তারা কুরআনের প্রতি ঈমান এনে ইসলাম গ্রহণ করে। শুধুমাত্র গোঁড়া কাফেররাই সত্যকে উপলব্ধি করেও নানা কারণে তা গ্রহণ করতে রাজি হয় না। অবশ্য সত্য প্রত্যাখ্যান করে তারা ইসলাম বা কুরআনের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। এদের অবস্থা সেই ব্যক্তির মতো যে সূর্যের আলো ঘরে প্রবেশ করতে না দেয়ার জন্য নিজের ঘরের জানালায় মোটা পর্দা টেনে দেয়। এই কাজের মাধ্যমে সে সূর্যের বিশালত্বকে খাটো করতে পারে না বরং নিজে সূর্যের আলো থেকে বঞ্চিত হয়।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. পবিত্র কুরআন পূর্ববর্তী ঐশী কিতাবগুলোর প্রতি সম্মান দেখানোর পাশাপাশি সেসব কিতাবের অনুসারীদেরকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানায়।

২. সেই ব্যক্তি আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পন করে যে নিজের ধর্মবিশ্বাসের প্রতি উগ্রতা পোষণ না করে পরবর্তী রাসূল আসার পর তাঁর ও তাঁর ওপর অবতীর্ণ কিতাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে।

সূরা আনকাবুতের ৪৮ ও ৪৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَمَا كُنْتَ تَتْلُو مِنْ قَبْلِهِ مِنْ كِتَابٍ وَلَا تَخُطُّهُ بِيَمِينِكَ إِذًا لَارْتَابَ الْمُبْطِلُونَ (48) بَلْ هُوَ آَيَاتٌ بَيِّنَاتٌ فِي صُدُورِ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ وَمَا يَجْحَدُ بِآَيَاتِنَا إِلَّا الظَّالِمُونَ (49)

"এবং তুমি তো এর পূর্বে কোনো কিতাব পাঠ করোনি এবং স্বহস্তে কোনো কিছু লেখনি যে, মিথ্যাবাদীরা সন্দেহ পোষণ করবে।" (২৯:৪৮)

"বস্তুত যাদের জ্ঞান দেয়া হয়েছে তাদের অন্তরে এটি (অর্থাৎ কুরআন) স্পষ্ট নিদর্শন। কেবল জালেমরাই আমার নিদর্শন অস্বীকার করে।" (২৯:৪৯)

পূর্ববর্তী ঐশী কিতাবগুলোর বিষয়বস্তুর সঙ্গে পবিত্র কুরআনের বিষয়বস্তুর মিল থাকার পাশাপাশি এই আয়াতে পবিত্র কুরআনের সত্যতার আরেকটি নিদর্শন উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, পবিত্র কুরআন নাজিল শুরু হওয়ার আগে আল্লাহর নবী কোনোদিন স্কুলে যাননি এবং তিনি ছিলেন নিরক্ষর। কাজেই তিনি এমন কোনো কিতাব পড়েননি যার ভিত্তিতে কুরআনের আয়াতগুলো নিজে থেকে তৈরি করে মানুষের সামনে তুলে ধরবেন। যারা তার নবুওয়াতের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চায় তারা একথা বলতে পারবে না যে, বিশ্বনবী (সা.) আগের ঐশী গ্রন্থগুলো অধ্যয়ন করে কুরআনের আয়াতগুলো নিজেই তৈরি করেছেন।

একজন নিরক্ষর ব্যক্তির পক্ষ থেকে এত উঁচু মানের শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরা সেই সময়ের আরব সমাজে ছিল বিরল ঘটনা। এছাড়া বিশ্বনবী এমন কিছু শিক্ষা তুলে ধরেন যা ছিল তখনকার সমাজে প্রচলিত সংস্কৃতির পরিপন্থি। এ বিষয়টিও পবিত্র কুরআনের অলৌকিকত্বের আরেকটি বড় নিদর্শন। এ কারণে পরের আয়াতে বলা হচ্ছে: এই কিতাবের সত্যতা এর আয়াতগুলোতে লুকিয়ে আছে এবং জ্ঞানী ব্যক্তিরা তা উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু যারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছে এবং কুরআনকে অস্বীকার করেছে তারা এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে না।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:

১. কখনো কখনো মহান আল্লাহর ইচ্ছায় একজন নিরক্ষর ব্যক্তিও মানুষকে সঠিক পথ প্রদর্শনের মাধ্যমে মানবজাতির গতিপথ পাল্টে দিতে পারেন। অন্যদিকে একজন শিক্ষিত মানুষও আল্লাহকে অস্বীকার করার মাধ্যমে সমাজকে বিপথগামী করে তুলতে পারে।  

২. আমাদেরকে বিচক্ষণতার সঙ্গে শত্রুর যেকোনো অজুহাত ও ষড়যন্ত্র রুখে দিতে হবে।

৩. যারা সত্যিকার অর্থে জ্ঞানী তারা সর্বান্তকরণে পবিত্র কুরআনের সত্যতা উপলব্ধি করতে পারে।#