মে ৩১, ২০১৭ ১২:০৭ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আনকাবুতের ৫০ থেকে ৫৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৫০ ও ৫১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَقَالُوا لَوْلَا أُنْزِلَ عَلَيْهِ آَيَاتٌ مِنْ رَبِّهِ قُلْ إِنَّمَا الْآَيَاتُ عِنْدَ اللَّهِ وَإِنَّمَا أَنَا نَذِيرٌ مُبِينٌ (50) أَوَلَمْ يَكْفِهِمْ أَنَّا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ يُتْلَى عَلَيْهِمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَرَحْمَةً وَذِكْرَى لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ (51)

"এবং ওরা বলে- তার প্রতিপালকের নিকট হতে তার কাছে কোনো অলৌকিক নিদর্শন প্রেরিত হয় না কেন? বলো- নিদর্শন আল্লাহর অধিকারভুক্ত। আমি তো একজন প্রকাশ্য সতর্ককারী মাত্র।" (২৯:৫০)  

"এটা কি ওদের জন্য যথেষ্ট নয় যে, আমি তোমার নিকট (আসমানী) কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যা ওদের নিকট (অনবরত) পাঠ করা হয়? এই কিতাবে অবশ্যই বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য অনুগ্রহ ও উপদেশ আছে।" (২৯:৫১)

গত আসরে আমরা মহাগ্রন্থ আল-কুরআন ও বিশ্বনবী (সা.)’র নবুওয়াতের সত্যতার কিছু প্রমাণ উপস্থাপন করেছি। আজকের এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: এসব প্রমাণ সত্ত্বেও কাফেররা নতুন নতুন অজুহাত উত্থাপন করে এবং বলে: মোহাম্মাদ কেন মূসা ও ঈসার মতো আল্লাহর কাছ থেকে অলৌকিক নিদর্শন এনে মানুষকে দেখায় না? ধূসর মরু প্রান্তরে সে কেন পানির ঝর্নাধারা প্রবাহিত করে না? কেন সে তার আল্লাহর কাছ থেকে লিখিত কোনো চিঠি আমাদের সামনে উপস্থিত করে না?

কাফেররা দৃশ্যত এসব দাবি তুললেও বাস্তবতা হচ্ছে- তারা ঈমান আনার লক্ষ্যে এ ধরনের অলৌকিক নিদর্শন দেখতে চায়নি বরং ঈমান না আনার অজুহাত হিসেবে এসব দাবি তুলেছিল। অতীতের জাতিগুলো হযরত মূসা ও হযরত ঈসার অলৌকিক নিদর্শন দেখেও আল্লাহর প্রতি ঈমান আনেনি। তারা বরং অলৌকিক নিদর্শন দেখার পর অন্য কোনো অজুহাত তুলে আল্লাহর নবীকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনকে বিশ্বনবী (সা.)’র প্রতি শ্বাশ্বত মুজিযা বা অলৌকিক নিদর্শন হিসেবে পাঠিয়েছেন। কাফেররা অনেক চেষ্টা করেও কুরআনের একটি সূরা এমনকি একটি আয়াতের মতো আয়াতও রচনা করতে পারেনি। এ ছাড়া, তারা যে মুজিযার দাবি তুলেছে তা তো বিশ্বনবীর হাতে ছিল না বরং আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছা করলেই কেবল অলৌকিক ঘটনা দেখাতে পারেন। কিন্তু সেটা আবার কাফেরদের পছন্দ নয়। তারা দাবি করছিল- তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী যখন তখন মুযিজা দেখাতে হবে।

নবী-রাসূলদের দায়িত্ব হচ্ছে মানুষকে পরকালীন শাস্তি ও পুরস্কারের সংবাদ মানুষের সামনে তুলে ধরে তাদেরকে সৎপথের দাওয়াত দেয়া। এই বিষয়টি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যাদু-টোনা বা অভূতপূর্ব কোনো নিদর্শন দেখিয়ে মানুষকে নিজের আশপাশে জড়ো করা আল্লাহর প্রেরিত পুরুষদের মূল লক্ষ্য ছিল না। মক্কার কাফেররা এ ধরনের বিস্ময়কর জিনিস দেখতে চাইতো। কিন্তু রাসূলের কাছে প্রেরিত কুরআন যে আরো অনেক উঁচু মানের আধ্যাত্মিক মুজিযা এবং কিয়ামত পর্যন্ত এই অলৌকিক নিদর্শন টিকে থাকবে তা বোঝার মতো ক্ষমতা তাদের ছিল না। বিশ্বনবীর মতো একজন নিরক্ষর মানুষ এমন একটি কিতাব আনলেন যার একটি আয়াতের সমান আয়াত তখনকার সেরা পণ্ডিতও রচনা করতে পারেনি। আর মহান আল্লাহ এই নিরক্ষর মানুষটিকে কিয়ামত পর্যন্ত গোটা মানবজাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত করেছেন।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. শেষ নবীর মুজিযা হচ্ছে পবিত্র কুরআন যা বিশ্বজনীন ও শ্বাশ্বত।

২. কুরআন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান যাতে মানুষের সব আত্মিক প্রয়োজন মেটানো হয়েছে। সর্বযুগের সব শ্রেণির মানুষ এই গ্রন্থ পড়ে তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।

৩. কুরআন মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়ে আল্লাহর অসীম রহমত ও অনুগ্রহ লাভের সুযোগ এনে দেয়।

সূরা আনকাবুতের ৫২ ও ৫৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

قُلْ كَفَى بِاللَّهِ بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ شَهِيدًا يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالَّذِينَ آَمَنُوا بِالْبَاطِلِ وَكَفَرُوا بِاللَّهِ أُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ (52) وَيَسْتَعْجِلُونَكَ بِالْعَذَابِ وَلَوْلَا أَجَلٌ مُسَمًّى لَجَاءَهُمُ الْعَذَابُ وَلَيَأْتِيَنَّهُمْ بَغْتَةً وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ (53)   

"(হে রাসূল তুমি কাফেরদের) বলো- আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে তা তিনি অবগত এবং যারা অসত্য বিষয়ে বিশ্বাস করে ও আল্লাহকে অস্বীকার করে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।" (২৯:৫২)

"ওরা তোমাকে (ঐশী) শাস্তি ত্বরান্বিত করতে বলে, যদি শাস্তির সময় নির্ধারিত না থাকত, তবে অবশ্যই শাস্তি আসত। (এবং নিশ্চয়) ওদের উপর শাস্তি  নেমে আসবে এবং তারা তা জানতেও পারবে না।" (২৯:৫৩)

এই দুই আয়াতে একদিকে বিশ্বনবীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলা হচ্ছে, কাফেররা সত্য প্রত্যাখ্যান করা সত্ত্বেও আপনি হতাশ হয়ে পড়বেন না কারণ, মহান আল্লাহ আপনার প্রচেষ্টা দেখছেন এবং তিনি আপনাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাবেন। অন্যদিকে আল্লাহর রাসূল কাফেরদের একথা জানিয়ে দিচ্ছেন যে, যদি আমি তোমাদের নবী না হই এবং আল্লাহর সম্পর্কে মিথ্যা বলে থাকি তাহলে তিনি আমাকে অপমানিত করবেন; কারণ তিনি আসমান-জমিনের সবকিছু জানেন এবং আমি সত্যি নাকি মিথ্যা বলছি তাও তিনি দেখতে পাচ্ছেন।

পরের আয়াতে একরোখা কাফেরদের বক্তব্য তুলে ধরে বলা হচ্ছে: তারা তাদের ওপর ঐশী আজাব নাজিল করার আহ্বান জানায়। অথচ মহান আল্লাহ মানুষকে নিজের চলার পথ বাছাই করার স্বাধীনতা দিয়েছেন এবং এই স্বাধীনতা ভোগ করার জন্য তাদেরকে নিদিষ্ট কিছু সময়ও দান করেছেন।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি দিক হচ্ছে:

১. কাফেররা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের পরিবর্তে বাতিলের পথ অনুসরণ করলে ঈমানদার ব্যক্তিরা যেন হতাশ হয়ে না পড়ে। কারণ, আল্লাহ সবকিছু দেখেন এবং সত্যবাণী শোনার পরও যারা ঈমান আনবে না ইহকাল ও পরকালে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

২. স্বয়ং আল্লাহ বিশ্বনবী (সা.)’র সত্যবাদিতার সাক্ষী দিয়েছেন।

৩. মহান আল্লাহ তার অবাধ্য বান্দাদের শাস্তিও দেন অত্যন্ত বিজ্ঞজনোচিত্তে এবং সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে। এ কাজে তিনি তাড়াহুড়া করেন না এবং কাফেরদের মর্জিমতোও এ শাস্তি নেমে আসে না।

সূরা আনকাবুতের ৫৪ ও ৫৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  يَسْتَعْجِلُونَكَ بِالْعَذَابِ وَإِنَّ جَهَنَّمَ لَمُحِيطَةٌ بِالْكَافِرِينَ (54) يَوْمَ يَغْشَاهُمُ الْعَذَابُ مِنْ فَوْقِهِمْ وَمِنْ تَحْتِ أَرْجُلِهِمْ وَيَقُولُ ذُوقُوا مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ (55)  

"ওরা তোমাকে (ঐশী) শাস্তি ত্বরান্বিত করতে বলে। (অথচ) জাহান্নাম তো সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের পরিবেষ্টন করে রয়েছে।" (২৯:৫৪)

"যেদিন শাস্তি ওদের গ্রাস করবে ঊর্ধ্ব ও অধঃদেশ হতে এবং (আল্লাহ তাদেরকে) বলবেন- তোমরা যা করতে তার (ফলাফলের) স্বাদ গ্রহণ করো।" (২৯:৫৫)

আগের আয়াতে কাফেররা তাদের প্রতি ঐশী শাস্তি ত্বরান্বিত করার যে আহ্বান জানিয়েছে তার জবাবে এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: তোমরা কেন অনর্থক তাড়াহুড়ো করছো? তোমরা এখনই জাহান্নামের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছো যদিও তা তোমরা উপলব্ধি করছো না। অন্যায় ও জুলুম, যুদ্ধ ও রক্তপাত, নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিতিশীতা এবং শঙ্কা, ভয় ও হতাশার জাহান্নামে ডুবে রয়েছো তোমরা। মক্কার কাফেররা ভাবত শুধুমাত্র ঝড়-তুফান, ভূমিকম্প এবং বন্যাই বুঝি ঐশী শাস্তি। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। কাফেররা তাদের কৃতকর্মের ফল হিসেবে যেসব সমস্যায় জর্জরিত রয়েছে সেগুলোই তাদের জন্য শাস্তি। এ ছাড়া, পরকালে জাহান্নামের শাস্তি তো তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছেই যেখানে আগুন তাদেরকে পরিবেষ্টন করে থাকবে, তা থেকে তারা পালিয়ে বাঁচতে চাইলেও তা সম্ভব হবে না।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. দুনিয়াতে আল্লাহ কাফেরদের শাস্তি পিছিয়ে দিয়ে তাদেরকে তওবা করে সঠিক পথে ফিরে আসার সুযোগ দেন। কিন্তু তারা এই সুযোগ গ্রহণ করে না।

২. প্রতিটি কাজের একটা অদৃশ্য দিক রয়েছে যা কিয়ামতের দিক প্রকাশ হয়ে পড়বে। পরকালে জাহান্নাম হবে এই দুনিয়ায় মানুষের অসৎ কর্মের বহিঃপ্রকাশ।#