মে ৩১, ২০১৭ ১২:৫৫ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আনকাবুতের ৫৬ থেকে ৬১ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৫৬ ও ৫৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ آَمَنُوا إِنَّ أَرْضِي وَاسِعَةٌ فَإِيَّايَ فَاعْبُدُونِ (56) كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ثُمَّ إِلَيْنَا تُرْجَعُونَ (57)

"হে আমার ঈমানদার বান্দাগণ! আমার জমিন প্রশস্ত, সুতরাং তোমরা কেবল আমার ইবাদত করো।" (২৯:৫৬)

"প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর তোমরা আমারই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে।" (২৯:৫৭)

ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ হচ্ছে ঈমান টিকিয়ে রাখার জন্য হিজরত করা। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মক্কার কাফিরদের অত্যাচারে নও মুসলিমদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল এবং তারা স্বাধীনভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে পারছিলেন না। এ কারণে, আল্লাহর নির্দেশে বিশ্বনবী (সা.) ও ঈমানদার ব্যক্তিরা মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করে সেখাবে বসবাস শুরু করেছিলেন।

এই আয়াতে আল্লাহর একটি সার্বজনীন নিয়মের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা ও আকর্ষণের কারণে তোমরা যেন আল্লাহর ইবাদত ও ঈমানদারির দিক দিয়ে পিছিয়ে না পড়ো। তোমরা মনে করো না যে, এই পৃথিবীতে তোমরা চিরকাল অবস্থান করবে। কাজেই ধন-সম্পদ অর্জন ও প্রভাব-প্রতিপত্তি ধরে রাখাকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য মনে করো না। যদি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করো যে, পরকালীন জীবনই হচ্ছে আসল ও চিরস্থায়ী জীবন তাহলে জন্মভূমির প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আকর্ষণ তৈরি করে এর মায়ায় বন্দি হয়ে থেকো না।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. জীবনযাপনের জন্য স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে ধর্ম ও ঈমান রক্ষার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

২. ধর্ম রক্ষার জন্য হিজরত করা ঈমানদার ব্যক্তির অন্যতম গুরুদায়িত্ব।

৩. যারা জন্মভূমি বা নির্দিষ্ট কোনো স্থানের প্রতি ভালোবাসার কারণে বিপথগামী হয়ে যায় কিয়ামতের দিন তাদের কোনো অজুহাত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

৪. মৃত্যু থেকে বেঁচে থাকার উপায় কারো নেই। কাজেই মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুতি নেয়াই হচ্ছে বুদ্ধিমানের কাজ।

সূরা আনকাবুতের ৫৮ ও ৫৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَالَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَنُبَوِّئَنَّهُمْ مِنَ الْجَنَّةِ غُرَفًا تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا نِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِينَ (58) الَّذِينَ صَبَرُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ (59)

"যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আমি অবশ্যই তাদের বসবাসের জন্য জান্নাতে সুউচ্চ প্রাসাদ দান করব। যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, যেখানে তারা স্থায়ী হবে। সৎকর্মশীলদের (জন্য) কত উত্তম পুরস্কার (রয়েছে)!" (২৯:৫৮)

"যারা ধৈর্য অবলম্বন করে ও তাদের প্রতিপালকের উপর নির্ভর করে।" (২৯:৫৯)

যারা নিজেদের ঈমান রক্ষা করার জন্য দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করেছেন এবং প্রয়োজনে নিজেদের বসতবাড়ি ছেড়ে হিজরত করেছেন তাদেরকে জান্নাতে সর্বোত্তম আবাসস্থল দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মহান আল্লাহ। এই আয়াতে ঈমানদার ব্যক্তিদের তিনটি গুণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যা তাদেরকে জান্নাতে পৌঁছে দেবে। গুণ তিনটি হলো, সৎকর্ম, ধৈর্যধারণ এবং আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ নির্ভরতা।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, মহান আল্লাহর কাছে সৎকাজবিহীন ঈমানের কোনো মূল্য নেই। সৎকাজও ধৈর্য ছাড়া করা সম্ভব নয়। আর আল্লাহর ওপর নির্ভরতা ছাড়া মানুষ নিরবচ্ছিন্নভাবে ধৈর্যধারণও করতে পারে না।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে:

১. জান্নাতে প্রবেশ ও এর অফুরন্ত নেয়ামত উপভোগের শর্ত হচ্ছে ঈমান ও সৎকর্ম।

২.  নিজের ঈমান রক্ষা করার জন্য মুমিন বান্দা এই পৃথিবীতে যা কিছু ত্যাগ করে কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাকে তার চেয়ে বহুগুণ উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করবেন।

৩. জীবনের নানা ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন ও প্রতিকূলতা মোকাবিলা করার একমাত্র চাবিকাঠি হচ্ছে ধৈর্যধারণ করা। ঈমানদার ব্যক্তিদেরকে অন্য সবার চেয়ে বেশি ধৈর্য ধরতে হয়।

সূরা আনকাবুতের ৬০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

وَكَأَيِّنْ مِنْ دَابَّةٍ لَا تَحْمِلُ رِزْقَهَا اللَّهُ يَرْزُقُهَا وَإِيَّاكُمْ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ (60)

"এবং বহু জীব-জন্তু আছে যারা নিজেদের খাদ্য মজুত রাখে না, আল্লাহ জীবনোপকরণ দান করেন ওদের ও তোমাদের এবং তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" (২৯:৬০)

আগের আয়াতে ঈমান রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনে হিজরত করার নির্দেশ দেয়ার পর এই আয়াতে বলা হচ্ছে: কাফেরদের দেশ থেকে হিজরত করলে স্বাভাবিকভাবেই মুমিন ব্যক্তি কর্মসংস্থান এবং সহায়সম্বল হারাবে। এ অবস্থায় আবার কর্মসংস্থান ও সহায়-সম্বল ফিরে পাওয়ার জন্য সে উদ্বেগের মধ্যে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। ঠিক এ কারণে, আল্লাহ তায়ালা মুমিন ব্যক্তিকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন, হিজরত অপরিহার্য হয়ে পড়লে ভয় পেও না। যিনি আসমান জমিনের সব প্রাণীর জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন তিনি তোমার কথা ভুলে যাবেন না। যেসব প্রাণী খাদ্য সঞ্চয় করতে পারে না এবং প্রতিদিন ক্ষুধার্ত অবস্থায় খাদ্যের সন্ধানে বাসা থেকে বেরিয়ে যায় তাদেরকে মহান আল্লাহ অভুক্ত অবস্থায় ফেরত পাঠান না।

মাতৃভূমি থেকে হিজরত করার কারণে যদি কর্মসংস্থান হারিয়ে যায় তাহলে আল্লাহ নতুন স্থানে ঈমানদার বান্দার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন। তবে কেউ যদি শিরক ও কুফরের জীবন বেছে নেয় অথবা জুলুম, অত্যাচার ও খোদাদ্রোহী শাসন মেনে নেয় তাহলে আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন না। কারণ, শিরক, কুফর ও জুলুম মানুষকে মনুষ্যত্বের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে:

১. আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করতে হলে রুটি-রুজি এবং দৈনন্দিন জীবনোপকরণ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। কর্মসংস্থান হারানোর ভয়ে হিজরত বন্ধ করা যাবে না।

২. মুমিন বান্দা সব সময় আল্লাহর ওপর ভরসা করে এবং রিজিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে কুণ্ঠিত হয় না।

৩. রিজিকের মালিক আল্লাহ এবং তিনি মানুষসহ সকল প্রাণীর অন্নসংস্থান করেন।

সূরা আনকাবুতের ৬১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ فَأَنَّى يُؤْفَكُونَ (61)   

"যদি তুমি ওদের (অর্থাৎ মুশরিকদের) জিজ্ঞাসা করো, কে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং চন্দ্র-সূর্যকে নিয়ন্ত্রণ করছেন? ওরা অবশ্যই বলবে- ‘আল্লাহ’, তাহলে ওরা কীভাবে (সত্য পথ থেকে) বিপথগামী হচ্ছে?" (২৯:৬১)

মক্কার মূর্তিপূজক কাফেররা সৃষ্টিজগতের মালিক হিসেবে আল্লাহকে বিশ্বাস করতো। কিন্তু সেইসঙ্গে চন্দ্র, সূর্য, তারকা বা নানা ধরনের মূর্তিকে তাদের জীবনের নিয়ন্ত্রণকারী বলে মেনে নিয়েছিল। তারা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে মেনে নিলেও তাঁকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মনে করতো না। তাদের দৃষ্টিতে তাদের রুটি-রুজি আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে ছিল না এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনে আল্লাহর কোনো হাত নেই।

দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান যুগেও এ ধরনের মানুষের অভাব নেই। এখনো বহু মানুষ আছে যারা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা মনে করলেও তাঁকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মনে করে না এবং তার আদেশ-নিষেধ মেনে চলে না। তারা মনে করে, জীবনযাপনের ক্ষেত্রে মানুষ স্বাধীন এবং তার যা খুশি তাই করতে পারে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে আমরা অন্যদের সঙ্গে আমাদের অভিন্ন বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ শুরু করতে পারি। মক্কার মুশরিকদের সঙ্গে মুসলমানদের ঐক্যের বিষয় ছিল মহান আল্লাহ।

২. সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা সব মানুষের ক্ষেত্রেই রয়েছে। আল্লাহকে শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্তা হিসেবে মেনে নিলেই হবে না বরং তাকে জীবনের সকল ক্ষেত্রে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মনে করতে হবে।#