সূরা আনকাবুত; আয়াত ৬২-৬৬ (পর্ব-১৩)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আনকাবুতের ৬২ থেকে ৬৬ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৬২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
اللَّهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَهُ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ (62)
"আল্লাহ তার বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা জীবিকা বর্ধিত করেন এবং যার জন্য ইচ্ছা তা হ্রাস করেন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বজ্ঞানী।" (২৯:৬২)
আগের আসরে আমরা বলেছি, মক্কার মুশরিকরা মুসলমানদের ওপর নানাভাবে অত্যাচার করতো। কাফেররা মুসলমানদেরকে কয়েক বছর অর্থনৈতিকভাবে অবরুদ্ধে করেও রেখেছিল। তারপরও মুসলমানদের কেউ কেউ মক্কা থেকে অন্য কোথাও হিজরত করতে রাজি ছিল না। এরপর আজকের এ আয়াতে বলা হচ্ছে: কর্মসংস্থান ও জীবিকা হারানোর ভয়ে ঈমান ত্যাগ করো না বরং ঈমানের পথে অটল থাকো এবং জেনে রেখো জীবিকা দানের মালিক একমাত্র আল্লাহ। প্রয়োজন হলে নিজেদের সহায়-সম্বল ত্যাগ করে মদীনায় হিজরত করো।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. জীবিকা অন্বেষণ করা আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব। কিন্তু কি পরিমাণ রিজিক আমরা পাবো তার নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নেই বরং এটি সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর নির্ভর করছে।
২. মানুষের রুটি-রুজির বিষয়টি অনেকটা তার জ্ঞান ও যোগ্যতার মতো। মহান আল্লাহ তাঁর প্রজ্ঞা অনুযায়ী যার যতটুকু প্রাপ্য তাকে ততটুকু জীবিকা ও জ্ঞান দান করেন। মানব সমাজ পরিচালনার জন্যই আল্লাহ তায়ালা এই পাথর্ক্য সৃষ্টি করেছেন।
সূরা আনকাবুতের ৬৩ ও ৬৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ نَزَّلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَحْيَا بِهِ الْأَرْضَ مِنْ بَعْدِ مَوْتِهَا لَيَقُولُنَّ اللَّهُ قُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ (63) وَمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَلَعِبٌ وَإِنَّ الدَّارَ الْآَخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ (64)
"এবং যদি তুমি ওদের জিজ্ঞাসা করো, ভূমি মৃত হবার পর আকাশ হতে বারি বর্ষণ করে কে ওকে সঞ্জীবিত করে? ওরা অবশ্যই বলবে- আল্লাহ। বলো- প্রশংসা একমাত্র আল্লাহরই কিন্তু ওদের অধিকাংশই চিন্তা করে না।" (২৯:৬৩)
"এবং এই পার্থিব জীবন ক্রীড়া কৌতুক ব্যতীত কিছুই নয়। পারলৌকিক জীবনই তো প্রকৃত জীবন। যদি ওরা জানত।" (২৯:৬৪)
পৃথিবীতে মানুষের জীবন-জীবিকা অনেকাংশে বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের কোনো এলাকায় যদি কয়েক বছর বৃষ্টি না হয় তাহলে সেখানকার গাছ-পালা, পশু-পাখি সব মারা পড়বে এবং দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। এই আয়াতে বলা হচ্ছে: এমনকি মক্কার মুশরিকরা পর্যন্ত বিশ্বাস করতো আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করার মালিক আল্লাহ। কিন্তু তারপরও তারা মূর্তিপূজা করতে ছুটতো এবং নিজেদের জীবনে সমৃদ্ধি আসার জন্য মূর্তিগুলোকে ভাগ্যনিয়ন্তা বলে মনে করতো। এদিকে কোনো কোনো ঈমানদার ব্যক্তিও জীবিকা হারানোর ভয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে এবং রুজি হারানোর আশঙ্কায় মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করা থেকে বিরত থাকে। এ ধরনের লোকদের উদ্দেশ করে এই আয়াতে বলা হচ্ছে: তারা কি জানে না মানুষের আসল জীবন ও জীবিকা রয়েছে পরকালে এবং দুনিয়ার জীবনের চাকচিক্য ক্ষণিকের জন্য মাত্র?
আসলে দুনিয়ার জীবনটা ক্রীড়া কৌতুক ছাড়া কিছু নয়। এখানে শিশুরা খেলনা নিয়ে খেলে আর বড়রা বাড়ি-গাড়ির পেছনে ছুটতে থাকে। শিশুদের খেলায় একজন রাজা হয় আরেকজন প্রজা, একজন হয় রোগী আরেকজন ডাক্তার, একজন হয় মা আরেকজন সাজে সন্তান। খেলা শেষ হয়ে গেলে বোঝা যায় এতক্ষণ যা কিছু খেলা হয়েছে তার সবই ছিল কাল্পনিক চরিত্র। বড়দের জীবনেও একই রকম খেলা চলছে। অনেক সাধনা করে আমরা প্রত্যেকে সমাজের একটি করে পেশায় নিয়োজিত হই। বয়স ফুরিয়ে গেলে বুঝতে পারি এতদিন যা কিছু করেছি তার সবই ছিল এক ধরনের খেলা। আমরা সমাজের কিছু কিছু চরিত্রে অভিনয় করেছি মাত্র। অতীতে যারা পরাক্রমশালী সম্রাট ছিল তার আজ কোথায়? ইতিহাসখ্যাত যুদ্ধগুলোর সেনাপতিরা আজ কোথায়? তাদের খেলার সময় শেষ হয়ে গেছে এবং আজ তাদের জায়গায় অন্য কেউ খেলছে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। পাপী ব্যক্তিদের অন্তর থেকে পাপের বোঝা সরিয়ে ফেললে তারাও এই বাস্তবতা স্বীকার করতে বাধ্য হবে।
২. পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে যারা বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকে এবং সৃষ্টিজগত সম্পর্কে চিন্তা করতে রাজি নয়।
৩. আখেরাত সম্পর্কে উদাসিনতা মানুষকে দুনিয়ার খেল-তামাশায় মত্ত করে রাখে।
৪. মানুষ প্রকৃত জীবনের স্বাদ উপভোগ করবে পরকালে। সেখানে প্রত্যেকে তার আমল অনুযায়ী স্থায়ী আবাস পাবে। সেখানে আল্লাহ কারো প্রতি জুলুম করবেন না বরং প্রত্যককে তার পাওনা বুঝিয়ে দেয়া হবে।
সূরা আনকাবুতের ৬৫ ও ৬৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
فَإِذَا رَكِبُوا فِي الْفُلْكِ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ فَلَمَّا نَجَّاهُمْ إِلَى الْبَرِّ إِذَا هُمْ يُشْرِكُونَ (65) لِيَكْفُرُوا بِمَا آَتَيْنَاهُمْ وَلِيَتَمَتَّعُوا فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ (66)
"ওরা যখন জলযানে আরোহণ করে (এবং তুফানের সম্মুখীন হয়) তখন ওরা বিশুদ্ধ চিত্তে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে (এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছু ভুলে যায়); অতঃপর তিনি যখন স্থলে ভিড়িয়ে ওদের উদ্ধার করেন, তখন ওরা আবার তার সঙ্গে (অন্য কাউকে) শরীক করে।" (২৯:৬৫)
"ফলে ওরা ওদের প্রতি আমার দান অস্বীকার করে এবং ভোগবিলাসে মত্ত থাকে; অচিরেই ওরা তা জানতে পারবে।" (২৯:৬৬)
মানুষের চিত্তকে জাগ্রত করার জন্য আসমান ও জমিনে আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন স্মরণ করিয়ে দিয়ে এই আয়াতে মানুষকে বলা হচ্ছে: যখন বিপদে পড়ো এবং চারদিকের সবকিছুর কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশা হারিয়ে ফেলো তখন তোমাদের কার কথা মনে হয় এবং কার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো? যখন গভীর সমুদ্রে জাহাজ ডুবে যেতে চায় তখন কাকে ডাকো? যখন আকাশে উড্ডয়নরত অবস্থায় বিমান ভূপাতিত হওয়ার উপক্রম হয় তখন কার কাছে সাহায্য চাও? তিনি হচ্ছেন সেই আল্লাহ যিনি তোমাদেরকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন।
দুনিয়ার জীবন পরিচালনার জন্য মানুষ বস্তুগত কিছু জীবনোপকরণ কিংবা বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের ওপর নির্ভর করে। কখনো বিপদে পড়লে তাদের সাহায্য চায়। এ কারণে সাধারণ বিপদে তারা আল্লাহকে স্মরণ করে না। কিন্তু তারা যদি এমন বিপদে পড়ে যা থেকে উদ্ধার করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় তখন তারা এক আল্লাহকে ডাকে এবং অন্য সবাইকে ভুলে যায়।
কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে- যে আল্লাহ মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন, বিপদ কেটে গেলে মানুষ সেই আল্লাহকে ভুলে যায়। এমনকি ওই মারাত্মক বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর কথাও তার মনে থাকে না।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. আল্লাহর প্রতি উদাসিনতা মানুষের অন্তরকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করে ফেলে। কিন্তু বিপদে পড়লে তার অন্তর জেগে ওঠে এবং আল্লাহকে খুঁজতে থাকে।
২. কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে তিনি তা দান করেন। এমনকি একজন কাফেরও যদি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর কাছে দোয়া করে তিনি তা কবুল করেন।
৩. আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করা হচ্ছে আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। অন্যদিকে একত্ববাদে বিশ্বাসের অর্থ আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া।#