সূরা আনকাবুত; আয়াত ৬৭-৬৯ (পর্ব-১৪)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আনকাবুতের ৬৭ থেকে ৬৯ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৬৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا جَعَلْنَا حَرَمًا آَمِنًا وَيُتَخَطَّفُ النَّاسُ مِنْ حَوْلِهِمْ أَفَبِالْبَاطِلِ يُؤْمِنُونَ وَبِنِعْمَةِ اللَّهِ يَكْفُرُونَ (67)
"ওরা কি দেখে না আমি ‘হারামকে’ ( অর্থাৎ কাবা শরীফের চারদিকের নির্ধারিত সীমিত স্থানকে) নিরাপদ স্থান করেছি, অথচ এর চারদিকে যেসব মানুষ আছে, তাদের উপর হামলা করা হয়, তবে কি ওরা মিথ্যাতেই বিশ্বাস করবে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?" (২৯:৬৭)
ইসলাম আবির্ভাবের আগে আরবদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ডাকাতি ও লুটতরাজ প্রচলিত ছিল। এক গোত্রের মানুষ অন্য গোত্রের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের অনেককে হত্য করে বাকিদের অপহরণ করে নিয়ে যেত। সেই সময় মহান আল্লাহ মক্কাকে নিরাপদ শহর হিসেবে ঘোষণা করেন যাতে সেখানকার অধিবাসীরা সম্মানিত হয় এবং অন্য কেউ মক্কায় হামলা করার সাহস না দেখায়। এক্ষেত্রে আব্রাহার হস্তি বাহিনীর ঘটনা উল্লেখযোগ্য। আব্রাহা বিশাল হস্তিবাহিনী নিয়ে মক্কায় এসেছিল আল্লাহর ঘর ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু আল্লাহর ঐশী নির্দেশে হাজার হাজার আবাবিল পাখি পাথর নিক্ষেপ করে আব্রাহার বাহিনীকে ধ্বংস করে দেয়।
এই আয়াতে মক্কার মুশরিকদের উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: তোমাদেরকে যখন মহান আল্লাহ এতবড় নিয়ামত ও নিরাপত্তা দান করেছেন তখন তোমরা কেন মূর্তিপূজা করছো? এটি কি আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা নয়?
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. নিরাপত্তা হচ্ছে মহান আল্লাহর দেয়া একটি বড় নেয়ামত। যেকোনো ধরনের শিরক ও কুফর থেকে দূরত্ব বজায় রাখার মাধ্যমে এই নিয়ামতের শোকর আদায় করতে হবে।
২. আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে মানুষকে এক আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দেয়ার কাজ সহজ হয়ে যায়।
সূরা আনকাবুতের ৬৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِالْحَقِّ لَمَّا جَاءَهُ أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَثْوًى لِلْكَافِرِينَ (68)
"যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্য রচনা করে অথবা তার নিকট হতে আগত সত্যকে অস্বীকার করে তার অপেক্ষা অধিক সীমালঙ্ঘনকারী আর কে? তবে কি জাহান্নামই কাফেরদের আবাসস্থল নয়?" (২৯:৬৮)
মানব সমাজে প্রচলিত রীতিতে যে ব্যক্তি সমাজের অন্য মানুষের অধিকার লঙ্ঘন করে তাকে বলা হয় জালেম বা সীমালঙ্ঘনকারী। ইসলামেও এ ধরনের সীমালঙ্ঘনকারীকে চরম ভর্ৎসনা করা হয়েছে। সেইসঙ্গে ইসলামে এর চেয়ে আরো বড় ধরনের সীমালঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে। মানুষ যদি মূর্তি বা অন্য কিছুকে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে তাহলে সে আল্লাহর প্রতি জুলুম বা সীমালঙ্ঘন করে। কারণ, এখানে যে বস্তু বা ব্যক্তি আল্লাহর সমকক্ষ নয় তাকে তার সমকক্ষ মনে করা হয়েছে। একইসঙ্গে কেউ যদি নবী-রাসূলদের মিথ্যাবাদী আখ্যা দিয়ে তাদের নবুওয়াতকে অস্বীকার করে তাহলে সে আল্লাহর প্রেরিত পুরুষদের প্রতি জুলুম করেছে। কারণ সেক্ষেত্রে সে মানবজাতিকে হেদায়েত করার জন্য এই মহাপুরুষদের অক্লান্ত পরিশ্রমকে উপেক্ষা করে এবং এই বিশাল নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
সাধারণ মানুষের অধিকার লঙ্ঘন করলে যখন কিয়ামতের দিন চরম শাস্তি পেতে হবে তখন আল্লাহ ও তার নবী-রাসূলদের অধিকার লঙ্ঘনের শাস্তি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
অবশ্য মানুষ নানা উপায়ে শিরক করতে পারে। সেটা হতে পারে মূর্তিপূজা অথবা হতে পারে ব্যক্তিপূজা, প্রবৃত্তিপূজা, অর্থপূজা বা অন্য কোনো কিছুর পূজা। কাজেই মুমিন ব্যক্তিদেরও এ ধরনের শিরকের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলার আশঙ্কা থেকে যায়। এ কারণে তাকে সব সময় সাবধান থাকতে হবে যাতে সে অন্য কোনো কিছুকে আল্লাহর সমকক্ষ না করে বসে।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
" সাংস্কৃতিক জুলুম হচ্ছে সবচেয়ে বড় সীমালঙ্ঘন। কারণ, এক্ষেত্রে সত্য বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে সমাজে মিথ্যার প্রচলন ঘটানো হয়। যে ব্যক্তি সত্য প্রত্যাখ্যান করে সে স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করে না।
২. ধর্মীয় বিধিবিধানের সঙ্গে কোনো কিছু যুক্ত করা এবং নিজের পছন্দ-অপছন্দকে ধর্মীয় রীতি বলে চালিয়ে দেয়া এক ধরনের বিদআত এবং আল্লাহর প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেয়ার শামিল। আমাদেরকে ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে চলতে হবে এবং নিজেদের চিন্তাধারা, পছন্দ-অপছন্দকে ধর্মীয় নির্দেশ বলে চালিয়ে দেয়া যাবে না।
সূরা আনকাবুতের ৬৯ বা শেষ আয়াতের দিকে দৃষ্টি দেব। এই আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ (69)
"এবং যারা আমার উদ্দেশ্যে (প্রচেষ্টা ও) সংগ্রাম করে আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সঙ্গী।" (২৯:৬৯)
ইসলামি সংস্কৃতিতে জিহাদ বা সংগ্রাম করতে বলা হয়েছে প্রকাশ্য শত্রু এবং অন্তরের শত্রু উভয়ের বিরুদ্ধে। মুমিন ব্যক্তিকে আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে এবং এ কাজের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে। একইসঙ্গে নিজের কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে যাতে সে প্রবৃত্তি দ্বারা পরিচালিত না হয়।
এই আয়াতে যে জিহাদের কথা বলা হয়েছে তা হচ্ছে আল্লাহর পথে এবং তাঁর জন্য জিহাদ করা। কেউ যদি আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং তার লক্ষ্য হয় সুনাম অর্জন বা গনীমাতের মাল সংগ্রহ করা তাহলে তার জিহাদ আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। কাজেই জিহাদ করার আগে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক লক্ষ্য ঠিক করা। যদি আল্লাহর রাস্তায় এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন লক্ষ্য না হয় তাহলে দৃশ্যত জিহাদ করতে গিয়ে জীবন দিলেও তা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হবে না। জিহাদে এ ধরনের প্রাণদান অর্থহীন।
অন্যদিকে জিহাদ যদি আল্লাহর রাস্তায় হয় তাহলে মহান আল্লাহ এই আয়াতে মানুষকে হেদায়েত দানের পাশাপাশি তাকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। আল্লাহর রাস্তায় চলতে গেলে নানা ধরনের কঠিন বাধা-বিপত্তি আসবে। অনেক সময় এই বাধা প্রতিহত করে সামনে এগিয়ে যাওয়া দুরুহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে মহান আল্লাহ এখানে মুমিন বান্দাদের এই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, কঠিন পরিস্থিতিতে আমি তোমাদেরকে সঠিক পথ দেখাতে এবং সংকট কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করব।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. মহান আল্লাহ সবার জন্য হেদায়েতের পথ উন্মুক্ত রাখলেও যারা আল্লাহর রাস্তায় চেষ্টা ও সংগ্রাম করে তাদেরকে বিশেষ হেদায়েত দান করেন। এই হেদায়েত পেতে হলে বান্দাকে আগে পদক্ষেপ নিতে হবে।
২. আমরা যদি যেকোনো কাজ সঠিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ঠিক করে শুরু করতে পারি তাহলে মহান আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক পথ নির্দেশ করেন।
৩. কেউ যদি আল্লাহর রাস্তায় চেষ্টা ও সংগ্রাম করে তাহলে লক্ষ্যে পৌঁছানো পর্যন্ত আল্লাহ তাকে সহযোগিতা করেন।#