জুন ১০, ২০১৭ ১৩:১২ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আর- রুমের ৯ থেকে ১৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৯ ও ১০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

أَوَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ كَانُوا أَشَدَّ مِنْهُمْ قُوَّةً وَأَثَارُوا الْأَرْضَ وَعَمَرُوهَا أَكْثَرَ مِمَّا عَمَرُوهَا وَجَاءَتْهُمْ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ فَمَا كَانَ اللَّهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ (9) ثُمَّ كَانَ عَاقِبَةَ الَّذِينَ أَسَاءُوا السُّوأَى أَنْ كَذَّبُوا بِآَيَاتِ اللَّهِ وَكَانُوا بِهَا يَسْتَهْزِئُونَ (10)

"ওরা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না এবং দেখে না ওদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কি হয়েছে? শক্তিতে তারা ছিল ওদের অপেক্ষা প্রবল, তারা জমি চাষ করত, তারা ওদের অপেক্ষা অধিক চাষাবাদ করত। তাদের নিকট তাদের রাসূলগণ স্পষ্ট নিদর্শনসহ এসেছিল (কিন্তু রাসূলগণকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে তারা ধ্বংস হয়ে গেছে)। বস্তুত ওদের প্রতি জলুম করার ইচ্ছা আল্লাহর ছিল না, বরং ওরা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল।" (৩০:৯)

"অতঃপর যারা মন্দ কাজ করেছিল, তাদের পরিণাম হয়েছে মন্দ; কারণ তারা আল্লাহর আয়াত প্রত্যাখ্যান করত এবং তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত।" (৩০:১০)

গত আসরে আমরা বলেছি, যারা বিশ্বজগত সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে না মহান আল্লাহ তাদের ভর্ৎসনা করেছেন। তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টির রহস্য উপলব্ধির চেষ্টা করার নির্দেশ দিয়েছেন মানুষকে। আর আজকের এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: তোমরা কেন অতীত জাতিগুলোর পরিণতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো না? বিভিন্ন স্থানে সফর করার সময় তোমরা কেন অতীত জাতিগুলোর ধ্বংসাবশেষের দিকে তাকিয়ে তা থেকে শিক্ষা নাও না? অতীত জাতিগুলোকে আমি সুজলা সুফলা ফসলের মাঠ ও ফলবতী গাছের বাগান দিয়েছিলাম। তারা প্রচুর সম্পদের অধিকারী ছিল এবং তাদের শক্তিও ছিল তোমাদের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে পাপকাজে লিপ্ত হওয়ার কারণে তাদেরকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে এবং আজ কেবল অবশিষ্ট আছে ওই জাতিগুলোর ধ্বংসাবশেষ।

ওইসব জাতি নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল বলেই ধ্বংস হয়ে গেছে। কারণ, ইসলামে অন্যের প্রতি জুলুম করতে যেমন নিষেধ করা হয়েছে তেমনি নিজের প্রতিও জুলুম করার অনুমতি নেই। পৃথিবীতে মানবসৃষ্ট মতবাদগুলোতে বলা হয়, যতক্ষণ পর্যন্ত অন্যের ক্ষতি না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষ যেকোনো কাজ করার ক্ষেত্রে স্বাধীন। কিন্তু ইসলামি সংস্কৃতিতে মানুষকে নিজের ক্ষতি করারও অনুমতি দেয়া হয়নি। মানুষ যখন নিজের বিবেকের আহ্বান অস্বীকার করে আল্লাহর একত্ববাদ ও আধিপত্য প্রত্যাখ্যান করে তখন সে নিজের প্রতি সবচেয়ে বড় জুলুম করে। এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. অতীত জাতিগুলোর ইতিহাস অধ্যয়নের জন্য ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো ভ্রমণ করতে পবিত্র কুরআনে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। 

২. বিশ্বজগত পরিচালিত হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট নিয়মে। কাজেই ভবিষ্যতে নিজেদের করণীয় ঠিক করতে অতীত জাতিগুলোর ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত।

৩. শুধুমাত্র ধন-সম্পদের দিক দিয়ে একটি জাতি সমৃদ্ধ হয়ে উঠলেই তাকে সফল জাতি বলা যাবে না; বরং সফলতার মূল চাবিকাঠি হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা এবং সৎকাজ করা। 

৪. অনবরত পাপকাজ করতে থাকলে মানুষের আত্মা মরে যায়। তখন সে সত্যকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর বাণী নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করে। এ ধরনের মানুষের পরিণতি হয় ভয়ঙ্কর।

সূরা রুমের ১১ থেকে ১৩ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  اللَّهُ يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ (11) وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ يُبْلِسُ الْمُجْرِمُونَ (12) وَلَمْ يَكُنْ لَهُمْ مِنْ شُرَكَائِهِمْ شُفَعَاءُ وَكَانُوا بِشُرَكَائِهِمْ كَافِرِينَ 13

"আল্লাহ সৃষ্টিকে অস্তিত্বে আনয়ন করেন, অতঃপর তিনি একে পুনরায় সৃষ্টি করবেন, তখন তোমরা তাঁরই নিকট উপনীত হবে।" (৩০:১১)

"যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন অপরাধীগণ হতাশ হয়ে পড়বে।" (৩০:১২)

"ওদের দেব-দেবীগুলি ওদের সুপারিশ করবে না এবং ওরাই ওদের দেব-দেবীগুলিকে অস্বীকার করবে।" (৩০:১৩) 

পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে, মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের পার্থিব জীবন শেষ হয়ে যায় এবং কবর হচ্ছে পরকালীন জীবনে প্রবেশে রাস্তা। আর এই তিন আয়াতে বলা হচ্ছে: এই পৃথিবীতে তোমাদের অস্তিত্ব তৈরি হওয়া এবং মৃত্যুতে তোমাদের কোনো হাত নেই। তোমরা আল্লাহর ইচ্ছায় এই পৃথিবীতে এসেছো এবং তারই ইচ্ছায় পরকালীন জীবনে প্রবেশ করতে হবে। কিয়ামতের দিনও তোমাদেরকে হাজির করা হবে আল্লাহর নির্দেশে। সেখানে  উপস্থিত হওয়া বা না হওয়ায় তোমাদের কোনো হাত নেই। কাজেই দুনিয়াতে এমনভাবে জীবনযাপন করো যাতে কিয়ামতের দিন অনুতপ্ত অবস্থায় খালি হাতে আল্লাহর সামনে হাজির হতে না হয়।

এই দুনিয়ার সম্পদ বা মানুষের সঙ্গে অতিরিক্ত মাত্রায় মায়ার বন্ধনে জড়ানো ঠিক নয়; কারণ পরকালে অন্য মানুষ বা সম্পদ কোনো কাজে আসবে না। সেদিন ঈমান এবং সৎকর্ম মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেবে। আল্লাহ বলছেন, আজ তোমরা যাদেরকে নিজেদের শাফায়াতকারী ভাবছো কিয়ামতের দিন তাদের অক্ষমতা তোমাদের কাছে পরিস্কার হয়ে যাবে। সেদিন তোমরা উপলব্ধি করবে তোমাদের মুক্তি দেয়ার জন্য তারা কিছুই করতে পারবে না।

মুশরিকরা নানা ধরনের মূর্তির পূজা করে এবং ভাবে শেষ বিচারের দিন এসব মূর্তি তাদেরকে রক্ষা করবে। কিন্তু কিয়ামতের দিন তারা উপলব্ধি করবে নিষ্প্রাণ এসব মূর্তির কোনো কিছু করার সামর্থ্য নেই। সেদিন তারা মূর্তির কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার ব্যাপারে যেমন নিরাশ হবে তেমনি আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়ারও আশা থাকবে না। কারণ, পৃথিবীতে তারা আল্লাহকে অস্বীকার এবং তার প্রেরিত নবী-রাসূলদের বিরুদ্ধাচরণ করেছে।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:

১. বিশ্বজগতের শুরু হয়েছে আল্লাহ থেকে এবং সবকিছু তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে। এই অকাট্য সত্য সম্পর্কে উদাসিনতা একদিন মানুষকে অনুতপ্ত ও হতাশ করবে।

২. দুনিয়াতে পাপী ও গোনাহগার ব্যক্তিদেরকে আনন্দ-ফুর্তি করতে দেখে আমরা যেন মন খারাপ না করি। কারণ, কিয়ামতের দিন এসব মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়বে।

৩. মূর্তি বা কোনো মানুষের পূজা করে কিয়ামতের দিন তাদের সুপারিশে আল্লাহর শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার আশা দুরাশা ছাড়া আর কিছু নয়। শেষ বিচারের দিন এসব উপাস্য তাদের কথিত দাসদের অস্বীকার করবে।#