সূরা আর-রুম; আয়াত ২৩-২৬ (পর্ব-৫)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আর- রুমের ২৩ থেকে ২৬ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ২৩ ও ২৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَمِنْ آَيَاتِهِ مَنَامُكُمْ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَابْتِغَاؤُكُمْ مِنْ فَضْلِهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِقَوْمٍ يَسْمَعُونَ (23) وَمِنْ آَيَاتِهِ يُرِيكُمُ الْبَرْقَ خَوْفًا وَطَمَعًا وَيُنَزِّلُ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَيُحْيِي بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ (24)
"এবং তার নিদর্শনবালী মধ্যে এক নিদর্শন (হচ্ছে): রাতে তোমাদের নিদ্রা এবং দিনে আল্লাহর অনুগ্রহ (এবং রিজিক) অন্বেষণ। এতে অবশ্যই নিদর্শন আছে শ্রবণকারী (বা মনযোগী) সম্প্রদায়ের জন্য।" (৩০:২৩)
"এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে এক নিদর্শন (হচ্ছে): তিনি তোমাদের (বজ্রপাতের) বিদ্যুৎ দেখান যা ভয় ও আশা সঞ্চার করে এবং তিনি আকাশ হতে পানি বর্ষণ করেন ও তার দ্বারা ভূমিকে ওর মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন; এতে জ্ঞানবান সম্প্রদায়ের জন্য অবশ্যই নিদর্শন আছে।" (৩০:২৪)
আগের পর্বে সূরা রুমের একাংশে মানুষ ও বিশ্বজগত সৃষ্টিতে মহান আল্লাহর নিদর্শনাবলী বর্ণনা করা হয়েছে। এই দুই আয়াতে আল্লাহর এ সংক্রান্ত দু’টি নিদর্শনের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: ঘুমের বিষয়টি হয়ত তোমাদের কাছে এটি অতি সাধারণ বিষয়। কিন্তু রাতে ঘুম এবং দিনে জাগ্রত হওয়ার মধ্যেও আল্লাহর নিদর্শন ও হেকমত রয়েছে। অর্থ উপার্জনের জন্য দিনে পরিশ্রম করা এবং সারাদিনের পরিশ্রমের পর রাতে বিশ্রাম করার ব্যবস্থা আল্লাহই করে দিয়েছেন। ঘুম যে কত বড় নেয়ামত তা একরাত ঘুমাতে না পারলে উপলব্ধি করা যায়। আল্লাহ যদি মানুষের ঘুমের ব্যবস্থা করে না দিতেন তাহলে সে সারাক্ষণ ক্লান্ত থাকত এবং জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলত।
আকাশে বিদ্যুৎ চমকালে এবং বজ্রপাত হলে মানুষ সাধারণত ভয় পায়। কিন্তু তারপরও এই বজ্রপাত বৃষ্টির সুসংবাদ বহন করে যে বৃষ্টির পানি ভূপৃষ্ঠের সব উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবন রক্ষা করে। পৃথিবীর যেসব অঞ্চলে দীর্ঘ সময়ের জন্য বৃষ্টি হয় না সেসব অঞ্চলের মানুষ এই বৃষ্টির মর্যাদা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করে। আধুনিক যুগে একটি শহরের ঘরে ঘরে পানি পৌঁছে দেয়ার জন্য সিটি কর্পোরেশনগুলোকে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। পানি তোলার পাম্প এবং পাইপ বসানোসহ অন্যান্য কাজে এই অর্থ ব্যয় হয়। অথচ মহান আল্লাহ সমুদ্রের লবণাক্ত পানিকে জলীয় বাস্প আকারে আকাশে তুলে নিয়ে মিষ্টি পানির আকারে তা বিভিন্ন জনপদে পৌঁছে দিচ্ছেন বিনা পয়সায়। কাজেই আল্লাহর এই নিদর্শন বা নেয়ামতগুলো নিয়ে আমাদেরকে বেশি বেশি চিন্তাভাবনা করতে হবে যাতে আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং আরো বেশি মনযোগ দিয়ে তাঁর ইবাদত করতে পারি।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. আমাদেরকে আল্লাহর নেয়ামতগুলোর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হবে। প্রতিদিনের ঘুম ও জাগ্রত হওয়া আমাদের প্রতি মহান আল্লাহর বিশাল অনুগ্রহ।
২. হালাল রুজি অর্জনের জন্য চেষ্টা ও পরিশ্রম করা ইসলামের দৃষ্টিতে একটি পছন্দনীয় কাজ এবং সংসারের ভরণপোষণের জন্য হালাল অর্থ উপার্জনের তাগিত দেয়া হয়েছে।
৩. আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ দুঘটনাক্রমে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অতি সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে এ ধরনের প্রাকৃতিক ঘটে।
৪. চিন্তা-গবেষণা ও ধীশক্তি দিয়ে প্রথমে আল্লাহকে চিনতে হবে এবং তারপর তাঁর ইবাদতে মশগুল হতে হবে।
সূরা রুমের ২৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَمِنْ آَيَاتِهِ أَنْ تَقُومَ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ بِأَمْرِهِ ثُمَّ إِذَا دَعَاكُمْ دَعْوَةً مِنَ الْأَرْضِ إِذَا أَنْتُمْ تَخْرُجُونَ (25)
"এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে এক নিদর্শন (হচ্ছে) তারই আদেশে আসমান ও জমিনের স্থিতি; অতঃপর আল্লাহ যখন তোমাদের মাটি হতে উঠবার জন্য আহ্বান করবেন, তখন তোমরা (কবর হতে) উঠে আসবে।" (৩০:২৫)
এই আয়াতে আল্লাহর আদেশে আকাশ ও ভূপৃষ্ঠের স্থিতি অবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অসীম মহাকাশ সম্পর্কে মানুষ এখন পর্যন্ত পুরোপুরি জানতে না পারলেও এ সম্পর্কে যতটুকু জ্ঞান অর্জিত হয়েছে তা রীতিমতো বিস্ময়কর। মহাকাশে রয়েছে অসংখ্য গ্রহ-নক্ষত্র যার প্রতিটি নিজস্ব কক্ষপথে ঘুরছে। প্রতি মুহূর্তের এই ঘুর্ণয়ন সত্ত্বেও কারো সঙ্গে কারো ধাক্কা লাগছে না। কখনো যদি এক সেকেন্ডের জন্য এর যেকোনো একটি গ্রহ বা নক্ষত্র থেমে যায় তাহলে একটির সঙ্গে আরেকটির ধাক্কা লেগে মহা বিপর্যয় ঘটে যাবে। অতি সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে মহান আল্লাহ যে এই মহাবিশ্বকে সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীল অবস্থায় রেখেছেন- এই আয়াতে সেকথাই উল্লেখ করা হয়েছে।
অবশ্য যেদিন আল্লাহ তায়ালা কিয়ামত সংঘটিত করার ইচ্ছা করবেন সেদিন তাঁর আদেশে বিশ্ব প্রকৃতির এই শৃঙ্খলা ভেঙে যাবে। সেদিন উদ্ভব হবে নতুন একটি জগতের। সেই জগতে মায়ের পেট থেকে মানুষের জন্ম হবে না বরং উদ্ভিদের মতো মাটি ফেটে কবর থেকে মানুষ বেরিয়ে আসতে থাকবে। মা, বাবা, ভাই, বোনের সম্পর্ক সেদিন কোনো কাজে আসবে না। প্রত্যেকে এই ইহকালীন জীবনের কৃতকর্মের জবাব দেয়ার জন্য আল্লাহর আদালতে হাজির হবে।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি দিক হচ্ছে:
১. নির্দিষ্ট নিয়মে সৃষ্টিজগত পরিচালিত হয়। এটি কোনো দৈব ঘটনা নয় বরং একমাত্র মহান আল্লাহর ইচ্ছায় এটি পরিচালিত হচ্ছে।
২. আল্লাহ তায়ালা এই বিশ্বজগত সৃষ্টি করে তা পরিচালনার জন্য অন্য কারো হাতে ছেড়ে দেননি। বাগানের মালির মতো গাছ লাগানোর পর তা বেড়ে ওঠা ও পরিচর্যার সব দায়িত্ব নিজের হাতে নিয়েছেন তিনি।
৩. এই আয়াতে কবর থেকে মানুষের উত্থিত হওয়ার যে কথা বলা হয়েছে তা থেকে বোঝা যায়, কেয়ামতের দিন মানুষের উপস্থিতি হবে সশরীরে। কারণ, রুহ বা আত্মার বিষয় হলে কবর থেকে ওঠার প্রশ্ন আসত না। কারণ, মৃত্যুর পর মানুষের শরীরই শুধু কবরে রাখা হয়, আত্মাকে নয়।
সূরা রুমের ২৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَلَهُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ كُلٌّ لَهُ قَانِتُونَ (26)
"আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে তা তারই। সকলেই তার আজ্ঞাবহ।" (৩০:২৬)
আগের আয়াতে এক জগত থেকে আরেক জগতে মানুষের প্রত্যাবর্তনের কথা উল্লেখের পর এই আয়াতে বলা হচ্ছে: মানুষ, ফেরেশতা ও জীনসহ আসমান ও জমিনের সব প্রাণীর মালিক যেহেতু মহান আল্লাহ, তাই তাদের ব্যাপারে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাও তাঁর রয়েছে। তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচরণ করার অধিকার কারো নেই।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দু’টি দিক হচ্ছে:
১. শুধু উদ্ভিদ ও প্রাণী নয় বরং মানুষ ও জ্বীনের মতো বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণীদেরও আল্লাহর নির্দেশিত নিয়মের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
২. জন্মের পর শারীরিক দিক দিয়ে মানুষ নিজের ইচ্ছা ছাড়াই ধীরে ধীরে বড় হয় এবং এক সময় পূর্ণাঙ্গ শরীরের অধিকারী হয়। কিন্তু আত্মিক দিক দিয়ে পূর্ণতা পেতে হলে তাকে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পুরোপুরি মেনে চলতে হবে। শারিরীক দিক দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্ণতা পাওয়া গেলেও আত্মিক পূর্ণতা অর্জন করতে হলে পরিশ্রম ও সাধনা করতে হয়।#