জুন ১১, ২০১৭ ১৫:০২ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আর- রুমের ২৭ থেকে ২৯ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ২৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  وَهُوَ الَّذِي يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَهُوَ أَهْوَنُ عَلَيْهِ وَلَهُ الْمَثَلُ الْأَعْلَى فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (27)

"এবং তিনি সৃষ্টিকে অস্তিত্বে আনয়ন করেন। অতঃপর তিনি একে পুনরায় সৃষ্টি করবেন; এই কাজ তাঁর জন্য সহজ। আসমান ও জমিনে তাঁরই মর্যাদা সর্বোচ্চ; তিনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" (৩০:২৭)

এই সূরার এর আগের কয়েকটি আয়াতে সৃষ্টিজগতে মহান আল্লাহর কিছু নিদর্শন তুলে ধরে হয়েছে। এসব নিদর্শনে আল্লাহ তায়ালার অসীম জ্ঞান, ক্ষমতা ও প্রজ্ঞা ফুটে উঠেছে। এরপর আজকের এ আয়াতে কেয়ামতের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: যে আল্লাহ একবার এই বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন তিনি কিয়ামতের দিন আবার সবকিছুকে নতুন করে সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখেন।

মহান আল্লাহর কাছে সহজ বা কঠিন বলে কোনো কথা নেই। সহজ এবং কঠিন শুধুমাত্র আমাদের অর্থাৎ মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কারণ, আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে নানা সীমাবদ্ধতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এই আয়াতে মহান আল্লাহ মানুষের ভাষায় কথা বলেছেন যাতে তা আমাদের বুঝতে সুবিধা হয়। তিনি বলছেন: তোমরা মানুষরা যখন দ্বিতীয়বার একটি জিনিস তৈরি করার সময় প্রথমবারের চেয়ে সহজে করতে পারো তখন মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর জন্য এ কাজ তো খুবই সহজ।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. আল্লাহর গুণবাচক নামগুলো মানুষের কল্পনার অনেক ঊর্ধ্বে এবং কোনো কিছু দিয়েই আল্লাহর কোনো গুণের তুলনা করা সম্ভব নয়। যেকোনো সৃষ্টির চেয়ে সব দিক দিয়ে তাঁর মর্যাদা অনেক বেশি।

২. আল্লাহর সৃষ্টির নিয়ম অনুসারে পার্থিব জীবনের পরে আরেকটি জগত থাকবে যেখানে এই দুনিয়ার কৃতকর্মের হিসাব দিতে হবে। কাজেই মৃত্যু মানে জীবনের শেষ হয়ে যাওয়া নয়।

সূরা রুমের ২৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

ضَرَبَ لَكُمْ مَثَلًا مِنْ أَنْفُسِكُمْ هَلْ لَكُمْ مِنْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ مِنْ شُرَكَاءَ فِي مَا رَزَقْنَاكُمْ فَأَنْتُمْ فِيهِ سَوَاءٌ تَخَافُونَهُمْ كَخِيفَتِكُمْ أَنْفُسَكُمْ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآَيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ (28)

"আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদেরই দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন; তোমাদের আমি যে উপজীবিকা দিয়েছে, তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসদাসীরা কি তাতে অংশীদার যাতে ওরা তোমাদের সমানে হতে পারে? এবং তোমরা তোমাদের সমকক্ষদের যেরূপ ভয় করো, ওদেরও কি সেরূপ ভয় করো? এইভাবেই আমি বোধশক্তি সম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য নিজ নিদর্শনাবলী বর্ণনা করি।" (৩০:২৮)

মুশরিকরা মহান আল্লাহর সঙ্গে এমন কিছু ব্যক্তি ও বস্তুকে শরিক করত যারা ছিল মূলত আল্লাহরই সৃষ্টি। কিন্তু তারা এসব ব্যক্তি বা বস্তুকে আল্লাহর মতো ক্ষমতাবান ও এই সৃষ্টিজগত পরিচালনায় তাঁর অংশীদার মন করত। এই আয়াতে মানুষের এই ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন করে মানুষেরই মতো উদাহরণ তুলে ধরে বলা হচ্ছে: তোমরা যেসব দাস-দাসীর মালিক তাদেরকে কি তোমাদের সম্পদের অংশীদার মনে করো? তোমাদের সম্পদ থেকে তাদেরকে কি তোমাদের মতো খরচ করতে দেবে? তোমরা যখন তোমাদের অধীনস্তকে তোমাদের সম্পদের অংশীদার মনে করতে পারো না তখন কী করে আল্লাহর সৃষ্টিকে তার অংশীদার বলে মনে করো? কীভাবে তোমরা মনে করো যে, সৃষ্টিজগত পরিচালনার ক্ষেত্রে আল্লাহ অন্য কারো সাহায্য নেন?

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. মানুষের বিবেক হচ্ছে তার সবচেয়ে বড় বিচারক। আমরা যখন আমাদের অধীনস্ত শ্রমিক ও কর্মচারীদেরকে নিজেদের অংশীদার মনে করতে পারি না তখন আল্লাহর সৃষ্টি কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকেও তাঁর অংশীদার করা উচিত নয়। এটি করা হবে সুস্পষ্ট শিরক ও আল্লাহর ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা।

২. পবিত্র কুরআন মানুষের বিচারবুদ্ধি ও বিবেকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কথা বলে এবং তাকে চিন্তাভাবনা ও গবেষণা করার আহ্বান জানায়।

সূরা রুমের ২৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

بَلِ اتَّبَعَ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَهْوَاءَهُمْ بِغَيْرِ عِلْمٍ فَمَنْ يَهْدِي مَنْ أَضَلَّ اللَّهُ وَمَا لَهُمْ مِنْ نَاصِرِينَ (29)

"যারা অজ্ঞতাবশত ও জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও সীমালঙ্ঘন করেছে তারা তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করেছে;  সুতরাং আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, কে তাকে সৎপথে পরিচালিত করবে? তাদের কোনো সাহায্যকারী নেই।" (৩০:২৯)

আগের আয়াতগুলোর ধারাবাহিকতায় এই আয়াতেও মানুষের বিবেকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। বলা হচ্ছে: যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো মানুষ বা বস্তুকে শরীক করেছে তারা তাদের বিবেক দ্বারা নয় বরং খেয়াল-খুশি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। কোনো ধরনের যৌক্তিক ভিত্তি ছাড়াই তারা আল্লাহর শরীক খুঁজে নিয়েছে; ফলে তারা নিজেদের প্রতি সবচেয়ে বড় জুলুম করেছে।

যারা বিচারবুদ্ধিকে বাদ দিয়ে ইচ্ছামতো কাজ করে আল্লাহ তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে দেন। এ ধরনের  মানুষের সৎপথে পরিচালিত হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা থাকে না। কারণ, সৎপথ উপলব্ধি করার জন্য বিচারবুদ্ধিকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। কিন্তু যারা বিচারবুদ্ধির ধার ধারে না বরং নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো চলে তারা সৎপথ পায় না এবং আল্লাহও তাদেরকে সাহায্য করেন না। তাদের সৎপথে ফিরে আসার একমাত্র উপায় হচ্ছে খেয়ালখুশি পরিত্যাগ করে বিবেকের আহ্বানে সাড়া দেয়া।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. সত্য-সরল পথ থেকে বিচ্যুতি নিজের প্রতি এক ধরনের জুলুম। ইসলামে নিজের প্রতি জুলুমের অপরাধ অন্যের প্রতি জুলুমের অপরাধের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। কারণ, নিজের প্রতি জুলুমের জের ধরে মানুষ এক সময় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতিও জুলুম করতে শুরু করে।

২. বর্তমান পৃথিবীতেও বৌদ্ধ ও হিন্দুসহ আরো অনেক ধর্মে আল্লাহর সঙ্গে নানা মূর্তিকে শরিক করা হয়। বিভিন্ন মানুষ ও পশুপাখির মূর্তি তৈরি করে তারা এগুলোকে সৃষ্টিকর্তার সমকক্ষ হিসেবে দাঁড় করায় এবং এগুলোর উপাসনা করে। এ থেকে বর্তমান আধুনিক যুগেও মানুষের মূর্খতা ও অজ্ঞতার প্রমাণ পাওয়া যায়। বর্তমান যুগে সবকিছু জ্ঞান ও বিচারবুদ্ধি দিয়ে চললেও ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক দিয়ে মানুষের মধ্যে এখনো রয়ে গেছে কুসংস্কার ও অজ্ঞতা।#