জুন ১২, ২০১৭ ১৩:২২ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আর- রুমের ৩৫ থেকে ৩৮ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৩৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

أَمْ أَنْزَلْنَا عَلَيْهِمْ سُلْطَانًا فَهُوَ يَتَكَلَّمُ بِمَا كَانُوا بِهِ يُشْرِكُونَ (35)

"আমি কি তাদের নিকট এমন কোনো দলিল অবতীর্ণ করেছি যা তাদেরকে আমার শরিক করতে বলে?" (৩০:৩৫)

আগের আয়াতগুলোর ধারাবাহিকতায় এই আয়াতে শিরক করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বলা হচ্ছে: মুশরিকরা আল্লাহর সঙ্গে অন্য যেসব উপাস্যকে শরিক করে সেজন্য কি তাদের কাছে উপযুক্ত দলিল-প্রমাণ আছে? তারা কি প্রকৃতিতে কিংবা নিজেদের অস্তিত্বে এমন কোনো আলামত দেখতে পেয়েছে যা থেকে প্রমাণ করা যায়, বিশ্বজগত পরিচালনায় আল্লাহর কোনো শরিক আছে? কিংবা তাদের কাছে কি এমন কোনো কিতাব নাজিল হয়েছে যাতে আল্লাহ নিজের শরীক থাকার কথা স্বীকার করেছেন? স্বাভাবিকভাবেই এসব প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক। মুশরিকরা কোনো ধরনের দলিল-প্রমাণ ছাড়াই অজ্ঞতা ও গোঁড়ামির কারণে পূর্বপুরুষদের দেখানো পথ অনুসরণ করে শিরকের এই ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করছে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ইসলাম নিজে যেমন দলিল-প্রমাণ ও যুক্তিনির্ভর ধর্ম তেমনি বিরুদ্ধবাদীদের কাছ থেকেও তাদের বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি প্রদানের দাবি জানায়।

২. তৌহিদ বা একত্ববাদের পক্ষে শক্ত ও গভীর যুক্তি থাকলেও শিরকি চিন্তাধারার কোনো ভিত্তি নেই।

সূরা রুমের ৩৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَإِذَا أَذَقْنَا النَّاسَ رَحْمَةً فَرِحُوا بِهَا وَإِنْ تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ إِذَا هُمْ يَقْنَطُونَ (36)

"আমি যখন মানুষকে অনুগ্রহের স্বাদ দেই, তখন ওরা ওতে আনন্দিত হয় এবং ওদের কৃতকর্মের কারণে ওরা দুর্দশাগ্রস্ত হলেই ওরা হতাশ হয়ে পড়ে।" (৩০:৩৬)

এই আয়াতে মুশরিক কিংবা দুর্বল ঈমানের অধিকারী ব্যক্তিদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। এ ধরনের মানুষ অহংকার এবং হতাশা- এই দুইয়ের মধ্যে হাবুডুবু খেতে থাকে। যখন আল্লাহ তাদেরকে নেয়ামত দান করেন তখন তারা অহংকারী হয়ে যায়। কিন্তু যখন কোনো সমস্যায় পড়ে তখন তারা হতাশ হয়ে পড়ে। অথচ প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তিরা নেয়ামত পেলে আল্লাহর শোকর আদায় করেন এবং বিপদে ধৈর্য ধারণ করেন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই আয়াতের পাশাপাশি এ ধরনের আরো অনেক আয়াতে মানুষকে দেয়া বিভিন্ন নেয়ামতকে আল্লাহর রহমত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বিপরীতে মানুষ যেসব দুঃখ-কষ্ট ও বিপদের মুখোমুখি হয় সেজন্য তার কৃতকর্মকেই দায়ী বলা হয়েছে। কাজেই দেখা যাচ্ছে, মহান আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি কেবল নেয়ামত ও রহমত বর্ষণ করতে চান। বান্দা কষ্টে পড়ুক তা তিনি চান না। কিন্তু মানুষ পাপকাজ করার কারণে তার ফল হিসেবে কষ্ট ও দুর্দশায় পতিত হয়।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ঈমানহীন ও দুর্বল ঈমানদার ব্যক্তিরা সাধারণত ধৈর্যহীন হয়। আল্লাহ তাদেরকে একটুখানি নেয়ামত দিলেই তারা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এবং অহংকারী হয়ে যায়। আর সামান্য বিপদে পড়লেই তারা হতাশ হয়ে পড়ে ও মনে করে, তারা বোধ হয় জীবনের শেষ প্রান্তে এসে গেছে।

২. পৃথিবীতে আল্লাহর দেয়া নেয়ামত স্থায়ী নয়; কাজেই এ সম্পদের মমতায় জড়ানো ঠিক নয়। যদি কেউ সম্পদের মায়ায় জড়িয়ে পড়ে তাহলে ওই সম্পদ হারিয়ে গেলে হতাশ ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

সূরা রুমের ৩৭ ও ৩৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّ اللَّهَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ (37) فَآَتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ ذَلِكَ خَيْرٌ لِلَّذِينَ يُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (38)

"ওরা কি লক্ষ্য করে না, আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা তার জীবিকা বর্ধিত করেন, অথবা হ্রাস করেন। নিঃসন্দেহে এতে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন আছে।" (৩০:৩৭)

"অতএব তোমরা আত্মীয়-স্বজনদেরকে তাদের প্রাপ্য দিও এবং দীন-দরিদ্র ও পথিকদেরও (দান করো); এই (দান) তাদের জন্য কল্যাণকর-যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে। এবং তারাই সফলকাম।" (৩০:৩৮)

আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এখানে বলা হচ্ছে: ঈমানদার ব্যক্তিরা মনে করেন, মানুষের জীবিকা রয়েছে একমাত্র আল্লাহর হাতে। এই জীবিকার বৃদ্ধি ও হ্রাস নির্ভর করে আল্লাহর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ওপর। পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে যারা সম্পদ অর্জনের জন্য ব্যাপক চেষ্টা চালালেও তেমন কিছুই অর্জন করতে পারে না। অন্যদিকে এমন অনেক মানুষ আছে যারা সামান্য পরিশ্রম করেই প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হয়ে যায়।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- আমাদেরকে স্বাভাবিক প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু এই প্রচেষ্টার ফল অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এসব বিষয়ের বেশিরভাগই আমাদের হাতে নেই। আমরা যদি সম্পদ অর্জনের জন্য প্রচুর পরিশ্রম করেও তা অর্জন করতে না পারি তাহলে হতাশ হয়ে যাই। কিন্তু যদি প্রচেষ্টা চালানোকে নিজেদের দায়িত্ব বলে মনে করি এবং এর ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেই তাহলে তিনি আমাদেরকে যতটুকু দেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে পারব। সেক্ষেত্রে আমরা বড় কিছু অর্জন করতে না পারার কারণে আল্লাহকে দায়ী করব না।  পরের আয়াতে অন্য মানুষের প্রতি আমাদের দায়িত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, যাকে আল্লাহ অধিক সম্পদ দান করেছেন তার কাঁধে দায়িত্বও অনেক বেশি। তাকে নিজ পরিবারের ভরণ-পোষণের পাশাপাশি সমাজের দরিদ্র মানুষদের প্রতিও দৃষ্টি দিতে হবে। এসব মানুষের মধ্যে নিকটাত্মীয়র অধিকার সবচেয়ে বেশি।

আয়াতের শেষাংশে দান করার উদ্দেশ্য ও নিয়ত সম্পর্কে বলা হয়েছে, দানশীল ব্যক্তির দান তখনই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে এবং কিয়ামতের দিন তার প্রতিদান পাওয়া যাবে যখন তা করা হবে শুধুমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য। সেক্ষেত্রে দানশীল ব্যক্তি দান গ্রহণকারীকে কখনো খোটা দেবে না এবং তার সামনে অহংকার করবে না।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি দিক হলো:

১. আমরা যদি মনে করি জীবিকা আসে একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে তখন তা থেকে দান করতে কুণ্ঠিত হবো না।

২. যদি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য দান করা না হয় তাহলে কিয়ামতের দিন এই দান কোনো কাজে আসবে না।

৩. ধনী ব্যক্তির সম্পদে আত্মীয়-স্বজন ও দরিদ্র ব্যক্তিদের অধিকার আছে। এই অধিকার প্রাপ্যকে ঠিকমতো দিয়ে দিতে হবে।

৪. ধনী ব্যক্তিদেরকে যাকাত ও খোমস দেয়ার পাশাপাশি সমাজ থেকে দারিদ্র দূর করার জন্য আরো সম্পদ দান করতে হবে। শুধুমাত্র যাকাত আদায় করে বসে থাকা উচিত নয়।

৫. সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূর করার দিকে ইসলাম যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। এ কারণে, সমাজের দরিদ্র ও বঞ্চিত শ্রেণিকে নানাভাবে সাহায্যের ব্যবস্থা করেছে এই ঐশী ধর্ম।#