জুন ১২, ২০১৭ ১৩:৫৭ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আর- রুমের ৩৯ থেকে ৪২ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৩৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَمَا آَتَيْتُمْ مِنْ رِبًا لِيَرْبُوَ فِي أَمْوَالِ النَّاسِ فَلَا يَرْبُو عِنْدَ اللَّهِ وَمَا آَتَيْتُمْ مِنْ زَكَاةٍ تُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُضْعِفُونَ (39)  

“মানুষের ধনে তোমাদের ধন বৃদ্ধি পাবে, এই উদ্দেশ্যে তোমরা সুদে যা দিয়ে থাক- আল্লাহর দৃষ্টিতে তা ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে না। কিন্তু তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য যাকাত দিয়ে থাকে, তারাই কয়েক গুণ (পুরস্কার) লাভ করে।”(৩০:৩৯)

 সূরা রুমের ৩৮ নম্বর আয়াতে দুঃস্থ লোকদেরকে দান করার কথা বলা হয়েছিল।  কিন্তু এই আয়াতে আল্লাহর জন্য দান এবং মানুষকে দেখানোর জন্য দানের তুলনা করে বলা হচ্ছে: তোমরা মানুষকে যা দাও তা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হয় এবং অন্য কোনো উদ্দেশ্য বা অভিসন্ধি না থাকে তাহলে এর পুরস্কার দেবেন স্বয়ং মহান আল্লাহ এবং এ পুরস্কার হবে দান করা অর্থ বা সম্পদের কয়েক গুণ।  কিন্তু মানুষকে সাহায্য করার লক্ষ্য যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি না হয়ে অন্য কিছু হয়ে থাকে অর্থাৎ সুদ খাওয়া বা দানের অর্থ আবার নিজের হাতে ফিরে আসার পরোক্ষ লক্ষ্য থাকে তাহলে তা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারবে না এবং এজন্য আল্লাহ কোনো পুরস্কারও দেবেন না।

যে ব্যক্তি অন্যকে ঋণ দেয় এই শর্তে যে টাকা ফেরত দেয়ার সময় অতিরিক্ত কিছু টাকা এখানে যোগ করে দিতে হবে তাহলে সে তার সম্পদ বাড়ানোর জন্য এ কাজ করেছে। এজন্য আল্লাহর কাছ থেকে সে কোনো পুরস্কার পাবে না।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. দান করা বা ঋণ দেয়ার সময় নিয়ত বা উদ্দেশ্যই আসল।  কি পরিমাণ দান করা বা ঋণ দেয়া হলো তা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়।

২. যেকোনো কাজের মর্যাদা বেড়ে যাওয়া নির্ভর করে সেটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করা হলো কিনা তার ওপর।

৩. পার্থিব জীবন একটি বাজারের মতো। এখানে কেউ বেচাকেনা ও লেনদেন করে এই দুনিয়াতেই লাভবান হওয়ার জন্য। আবার কেউ এখানে মহান আল্লাহর সঙ্গে লেনদেন করে পরকালে প্রতিদান পাওয়ার উদ্দেশ্যে।

সূরা রুমের ৪০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  اللَّهُ الَّذِي خَلَقَكُمْ ثُمَّ رَزَقَكُمْ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ هَلْ مِنْ شُرَكَائِكُمْ مَنْ يَفْعَلُ مِنْ ذَلِكُمْ مِنْ شَيْءٍ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ (40)

“আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাদের জীবিকা দিয়েছেন। তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন ও পরে তোমাদের জীবিত করবেন। তোমাদের দেবদেবীগুলোর মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যে এই সমস্তের একটিও করতে পারবে? ওরা যাদের শরিক করে আল্লাহ তা হতে পবিত্র, মহান।” (৩০:৪০)

এই আয়াতে মহান আল্লাহর এমন কিছু কাজের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যা করা তিনি ছাড়া আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়। বলা হয়েছে: তোমাদেরকে সৃষ্টি, সারাজীবনের জন্য রিজিকের ব্যবস্থা করা, তোমাদের মৃত্যু এবং কিয়ামতের দিন আবার তোমাদের পুনরুজ্জীবন- এ সব কিছুই আল্লাহ তায়ালার হাতে রয়েছে।  তাহলে কেন তোমরা কিছু বস্তু বা ব্যক্তিকে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করছ? তোমাদের জীবন, মরণ, পুনরুজ্জীবন কিংবা রিজিক দান করা কি এসব উপাস্যের পক্ষে সম্ভব? মুশরিকরা যদি এই দু’টি প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করে তাহলে তারা এর কোনো জবাব খুঁজে পাবে না।  তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে এসব উপাস্যের কোনো ভূমিকা তাদের জীবনে নেই। তারা শুধুমাত্র পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করতে গিয়ে এসব দেবদেবী ও উপাস্যের পূজা করছে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. আমাদের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত ও রুজি মহান আল্লাহর হাতে রয়েছে।  কাজেই আমাদের উচিত শুধুমাত্র তাঁর ইবাদত করা ও তাঁর সঙ্গে অন্য কাউকে শরীক না করা।

২. আমাদের চারপাশে যা কিছু দেখতে পাই তার সবই মহান আল্লাহর সৃষ্টি।  আল্লাহ ছাড়া আর কারো পক্ষে ক্ষুদ্রতম কোনো বস্তুও অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে অস্তিত্বে আনা সম্ভব নয়।  মানুষ শুধু সৃষ্ট বস্তুর আকৃতি পরিবর্তন করতে পারে মাত্র।

সূরা রুমের ৪১ ও ৪২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

  ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُمْ بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ (41) قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِنْ قَبْلُ كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُشْرِكِينَ (42)

“স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা (আল্লাহর দিকে) ফিরে আসে।” (৩০:৪১)

“বলুন, তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো এবং দেখো, তোমাদের পুর্ববর্তীদের পরিণাম কি হয়েছে। তাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক।” (৩০:৪২)

আগের আয়াতে মুশরিকদের চিন্তাধারার অসারতা প্রমাণের পর এই আয়াতে বলা হচ্ছে: পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টিতে মানুষের চিন্তাধারা ও কর্মের মধ্যে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।  সমাজে সৃষ্ট সব ধরনের সমস্যার মূলে রয়েছে মহান আল্লাহর আদেশ অমান্য করা কিংবা আল্লাহকে ভুলে যাওয়া। অর্থাৎ কুফর ও শিরক হচ্ছে সব বিপর্যয়ের মূল কারণ।  আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে যদি কেউ কাজ না করে এবং পাপকাজ করতে ভয় না পায় তাহলে সে নিজের পাশাপাশি তার পরিবার ও সমাজকেও পাপকাজের মাধ্যমে নানা ধরনের বিপদের মধ্যে ফেলে দেয়।  এসব কাজের কিছু পরিণতি দুনিয়ার মানুষ ভোগ করে এবং বাকিটার প্রতিদান পাপাচারী ব্যক্তিকে পরকালে ভোগ করতে হবে।

এজন্যই পবিত্র কুরআন মুসলমানদেরকে পৃথিবীর ইতিহাস জানতে উৎসাহিত করে। মহান আ।লাহ বলেন, অতীতের জাতিগুলোর পরিণতি দেখার পাশাপাশি সমসাময়িক যুগের বিভিন্ন জাতির আচরণ ও পরিণতি থেকে শিক্ষা নাও। কোন কাজ করলে কি পরিণতি হয় তা দেখার পরও তোমরা সেই পাপকাজে লিপ্ত হয়ো না।

বর্তমানে আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে অতীতের বহু সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ বা নিদর্শন দেখতে পাই। এসব সভ্যতা এক সময় মহাপরাক্রমশালী শক্তির অধিকারী ছিল, তাদের ছিল প্রচুর সম্পদ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস।  কিন্তু জুলুম, অপব্যয় ও বিলাসী জীবনযাপন করার জন্য তারা ধ্বংস হয়ে গেছে। আজ তাদের সেই জৌলুসপূর্ণ প্রাসাদগুলোর ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।  মজার ব্যাপার হচ্ছে, পবিত্র কুরআনে সব পাপ ও জুলুমের উৎস হিসেবে শিরকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।  এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, শিরকের পরিণতি ধ্বংস। অন্যদিকে তৌহিদ ও আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে প্রকৃত শান্তি ও সৌভাগ্য নিহিত রয়েছে।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. প্রকৃতির ওপর মানুষের পাপ ও অপরাধী কার্যক্রমের প্রভাব পড়ে।  মানুষের পাপের কারণে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। বর্তমানে জলবায়ূতে যে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা দিয়েছে তা মানুষেরই ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের কারণে হয়েছে।

২. জল-স্থলসহ গোটা প্রকৃতি ও পরিবেশ আমাদেরকে দেয়া মহান আল্লাহর আমানত।  এখানে কোনো ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টির অনুমতি তিনি আমাদেরকে দেননি।

৩. ইসলাম অতীত ও বর্তমান জাতিগুলোর পরিণতি থেকে শিক্ষাগ্রহণের উদ্দেশ্যে দেশ-বিদেশ সফর করার  নির্দেশ দিয়েছে।

৪. একটি সমাজের বেশিরভাগ মানুষ যখন অপরাধী কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে তখন সে সমাজের প্রতি মহান আল্লাহ ক্ষুব্ধ হন। এ ধরনের সমাজ থেকে হিজরত করে তুলনামূলক ভালো সমাজে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহতায়ালা।#