সূরা আর-রুম; আয়াত ৪৭-৪৯ (পর্ব-১১)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আর- রুমের ৪৭ থেকে ৪৯ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৪৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ رُسُلًا إِلَى قَوْمِهِمْ فَجَاءُوهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ فَانْتَقَمْنَا مِنَ الَّذِينَ أَجْرَمُوا وَكَانَ حَقًّا عَلَيْنَا نَصْرُ الْمُؤْمِنِينَ (47)
“এবং আমি তোমার পূর্বে রাসূলগণকে তাঁদের নিজ নিজ সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছি। তাঁরা তাদের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী নিয়ে আগমন করেন। অতঃপর যারা পাপী ছিল, তাদের আমি শাস্তি দিয়েছি (এবং মুমিনদের সাহায্য করেছি)। মুমিনদের সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।” (৩০:৪৭)
আগের পর্বে শেষ আয়াতে আমরা প্রাণী ও উদ্ভিদের প্রাণ রক্ষার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বাতাস ও বৃষ্টি পাঠানোর বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছিল। আর আজকের এ আয়াতে মানবজাতিকে হেদায়েত করার জন্য সুস্পষ্ট দলিলসহ নবী-রাসূল পাঠানোর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এর পরের আয়াতে আবার মৃত মাটিকে জীবিত করার জন্য বাতাস ও বৃষ্টি পাঠানোর প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন মহান আল্লাহ। প্রায় একই রকম প্রসঙ্গের মাঝখানে নবী-রাসূল পাঠানো সংক্রান্ত একটি আয়াত রাখার ব্যাপারে মুফাসসিরগণ মনে করেন, এর মাধ্যমে আল্লাহ তা’য়ালা একটি সূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করতে চেয়েছেন। আর তা হলো- মানবজাতির দৈহিক চাহিদা মেটানো ও বেঁচে থাকার জন্য যেমন তিনি সূর্য, মেঘ, বাতাস ও বৃষ্টি পাঠিয়েছেন তেমনি মানুষের আত্মিক চাহিদা মেটানোর প্রয়োজনে যুগে যুগে পাঠিয়েছেন নবী ও রাসূল। এসব মহামানবের দায়িত্ব ছিল বিচার-বুদ্ধি ও বিবেক ব্যবহার করে মানবজাতিকে সঠিক পথ প্রদর্শন করা।
স্বাভাবিকভাবেই যারা সত্য উপলব্ধি করে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে তারা মহান সৃষ্টিকর্তার দয়া, রহমত ও সহায়তা লাভ করবে। কিন্তু যারা মহান আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ ও তার নির্দেশ লঙ্ঘন করবে তারা তাঁর ক্রোধের শিকার হয়ে মহাশাস্তি ভোগ করবে।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. মহান আল্লাহ নবী-রাসূল, মুজিযা ও কিতাব পাঠিয়ে মানবজাতির প্রতি নিজের দায়িত্ব সম্পন্ন করেছেন। এরপর কোনো মানুষ আর কিয়ামতের দিন এ দাবি করতে পারবে না যে, আমার কাছে সত্যের বাণী পৌঁছেনি।
২. সত্যের বাণী পৌঁছে দেয়ার পর তা লঙ্ঘন করলেই কেবল অপরাধীকে শাস্তি দেয়া যায়। আল্লাহ তায়ালা এর ব্যত্যয় ঘটান না।
৩. মুমিনদেরকে কাফিরদের ওপর বিজয়ী করার প্রতিশ্রুতি মহান আল্লাহ নিজে মানবজাতিকে দিয়েছেন।
সূরা রুমের ৪৮ ও ৪৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
اللَّهُ الَّذِي يُرْسِلُ الرِّيَاحَ فَتُثِيرُ سَحَابًا فَيَبْسُطُهُ فِي السَّمَاءِ كَيْفَ يَشَاءُ وَيَجْعَلُهُ كِسَفًا فَتَرَى الْوَدْقَ يَخْرُجُ مِنْ خِلَالِهِ فَإِذَا أَصَابَ بِهِ مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ إِذَا هُمْ يَسْتَبْشِرُونَ (48) وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلِ أَنْ يُنَزَّلَ عَلَيْهِمْ مِنْ قَبْلِهِ لَمُبْلِسِينَ (49)
“তিনিই আল্লাহ, যিনি বায়ু প্রেরণ করেন, অতঃপর তা মেঘমালাকে সঞ্চারিত করে। অতঃপর তিনি মেঘমালাকে যেভাবে ইচ্ছা আকাশে ছড়িয়ে দেন এবং তাকে স্তরে স্তরে বিন্যস্ত করেন। এরপর তুমি দেখতে পাও তার মধ্য থেকে নির্গত হয় বৃষ্টিধারা। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের কাছে ইচ্ছা (এই বৃষ্টি) পৌঁছে দেন; তখন তারা মনের অজান্তেই আনন্দিত হয়।” (৩০:৪৮)
“যদিও তারা প্রথম থেকেই তাদের প্রতি এই বৃষ্টি বর্ষিত হওয়ার পূর্বে নিরাশ ছিল।” (৩০:৪৯)
সূর্যের প্রখর তাপে সাগরের পানি বাস্প হয়ে আকাশে উঠে যায়। এরপর মহান আল্লাহ এই বাস্প দিয়ে সৃষ্ট মেঘমালাকে বাতাসের মাধ্যমে শুস্ক ভূমির দিকে পাঠান। সেখানে প্রাকৃতিকভাবে এই বাস্প আবার পানিতে পরিণত হয় এবং বৃষ্টি আকারে ভূমিতে নেমে আসে। এই মহা প্রাকৃতিক যজ্ঞ প্রতিনিয়ত দেখতে দেখতে আমাদের কাছে এটি একটি ক্ষুদ্র স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই বিশাল কাজটি যে মানুষের জন্য কত কঠিন তা বোঝা যাবে পানি, তেল বা গ্যাস এক স্থান থেকে আরেক স্থানে নেয়ার জন্য মানুষকে কত কষ্ট করতে হয় তার ওপর ভিত্তি করে। বর্তমানে আমরা তেল ও গ্যাস স্থানান্তরের জন্য বিভিন্ন দেশকে কোটি কোটি ডলার খরচ করে পাইপলাইন স্থাপন করতে দেখি। এ ছাড়া, শহরের পানি সঞ্চালন লাইন বসাতে এবং তার রক্ষণাবেক্ষণ করতে সিটি কর্পোরেশনগুলোকে গলদঘর্ম হয়ে যেতে হয়। অথচ মানুষ এত পরিশ্রম করার পরও ভূপৃষ্ঠের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এলাকাকে নিজেদের কর্মকাণ্ডের আওতায় আনতে পারে।
অন্যদিকে মহান আল্লাহ বিশ্বব্যাপী মানুষসহ সব প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্য পানি বণ্টন করেন। এ কাজে মানুষকে কোনো খরচ বা পরিশ্রম করতে হয় না। বৃষ্টিবর্ষণের ফলে যে কেবল মানুষ শারীরিকভাবেই লাভবান হয় তা নয় বরং আত্মিকভাবেও প্রশান্তি লাভ করে। ফুল ও লতাপাতার ওপর বৃষ্টি বর্ষণের দৃশ্য এবং বর্ষার রিমঝিম শব্দ প্রতিটি মানুষকেই আন্দোলিত করে। মানুষের মন যতই খারাপ থাকুক, যত রকম উদ্বেগেই সে সময় কাটাক বৃষ্টির বারিধারা দেখলে তার মন আনন্দে নেচে উঠবেই। খরার কারণে যে কৃষক দীর্ঘদিন মাঠে ফসল ফলাতে পারছিলেন না তার জন্য বৃষ্টি বয়ে আনে অনাবিল আনন্দ ও খুশির ফল্গুধারা। আকাশে কালো মেঘের গর্জন কৃষকের মনে প্রবল আশা সঞ্চার করে। কাজেই এই বৃষ্টি ও বাতাস হচ্ছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো অসীম রহমত যার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. প্রাকৃতিক পরিবর্তন ও ঘটনাগুলোকে আমরা যেন দৈবক্রমে ঘটে যাওয়া বলে মনে না করি। এগুলো এই বিশ্বজগত পরিচালনার জন্য মহান আল্লাহর প্রজ্ঞা ও ক্ষমতার নিদর্শন।
২. আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে পাঠানো রহমত নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করলে মানুষের মনে হতাশা জন্ম নেয়ার কথা নয়। আমাদের সব সময় আল্লাহর সাহায্যের ব্যাপারে আশাবাদী থাকা উচিত। কারণ, মানুষের জীবনে কঠিন সময়ের পরে আসে সুখ, অভাব-অনটনের পরে আসে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য।#