জুন ১৫, ২০১৭ ১১:৪৫ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আর- রুমের ৫৫ থেকে ৬০ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৫৫ থেকে ৫৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ يُقْسِمُ الْمُجْرِمُونَ مَا لَبِثُوا غَيْرَ سَاعَةٍ كَذَلِكَ كَانُوا يُؤْفَكُونَ (55) وَقَالَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ وَالْإِيمَانَ لَقَدْ لَبِثْتُمْ فِي كِتَابِ اللَّهِ إِلَى يَوْمِ الْبَعْثِ فَهَذَا يَوْمُ الْبَعْثِ وَلَكِنَّكُمْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ (56) فَيَوْمَئِذٍ لَا يَنْفَعُ الَّذِينَ ظَلَمُوا مَعْذِرَتُهُمْ وَلَا هُمْ يُسْتَعْتَبُونَ (57)

“যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন অপরাধীরা কসম খেয়ে বলবে যে, তারা এক মুহূর্তের বেশি অবস্থান করেনি। এমনিভাবে তারা (দুনিয়াতেও) সত্যবিমুখ হতো।” (৩০:৫৫) 

“এবং যাদের জ্ঞান ও ঈমান দেয়া হয়েছে, তারা বলবে নিশ্চয় তোমরা আল্লাহর কিতাব মতে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবস্থান করেছ। এটাই পুনরুত্থান দিবস, কিন্তু তোমরা তা জানতে না।” (৩০:৫৬)

“সুতরাং সেদিন জালেমদের ওযর-আপত্তি কোনো উপকারে আসবে না এবং তওবা করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের সুযোগও তাদের দেয়া হবে না।” (৩০:৫৭)

অপরাধী ও কাফেরদের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা পার্থিব জীবনে পরকালকে অস্বীকার করে। যতভাবেই তাদের বোঝানো হোক না কেন তারা কিছুতেই পুনরুত্থান দিবসকে মেনে নিতে রাজি নয়। এই আয়াতে দেখা যাচ্ছে, এ ধরনের অবিশ্বাসীরা কিয়ামতের দিনও একথা বিশ্বাস করতে রাজি হবে না যে, কিয়ামত সংঘটিত হয়েছে এবং তারা পুনরুত্থান দিবসে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিনও তারা বলবে, এটাতো পৃথিবীর জীবনেরই অব্যাহত অংশ। আমরা কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম এবং এখন আবার জেগে উঠেছি। কিন্তু যেসব ঈমানদার সত্য উপলব্ধি করেছে তারা সেদিন অবিশ্বাসী কাফেরদের বলবে, এটি পুনরুত্থান দিবস। আল্লাহর নির্ধারিত ঘোষণা অনুযায়ী তোমরা দুনিয়া ও আখেরাতের মধ্যবর্তী বারযাখের জীবন অতিক্রম করে এখানে এসেছো। আজ শেষ বিচারের দিন।

জালেম ও অপরাধীরা যখন বুঝতে পারবে তারা কিয়ামতের দিন আল্লাহর আদালতে উপস্থিত হয়েছে তখন তাদের ভুল ভাঙবে। সে সময় তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং তওবা করতে উদ্যত হবে। কিন্তু এই আয়াতের বর্ণনা অনুযায়ী সেদিনের তওবা কোনো কাজে আসবে না। অপরাধীদের কোনো ক্ষমা প্রার্থনাই সেদিন আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি দিক হচ্ছে:

১. সত্য গ্রহণ না করলে মানুষ ধীরে ধীরে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। আর চিন্তা-চেতনায় বিভ্রান্তি আসলে মানুষের জন্য যেকোনো ধরনের জুলুম ও অপরাধ করা সহজ হয়ে যায়।

২. জ্ঞান ও ঈমান পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।  প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে ঈমানের দিকে আহ্বান জানায় এবং ঈমান মানুষকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান শিখতে উৎসাহিত করে।

৩. মানুষের ভবিষ্যত নির্ভর করে তার নিজের কৃতকর্মের ওপর। দুনিয়া এবং আখেরাতে জুলুম ও অপরাধ মানুষের জন্য সুখ কিংবা কল্যাণ বয়ে আনে না।

৪. আল্লাহর কাছে ভুল স্বীকার বা তওবা কেবল পার্থিব জীবনে কবুল হবে। কিয়ামতের দিন হাজারো তওবা করেও নিস্কৃতি পাওয়া যাবে না।

সূরা রুমের ৫৮ ও ৫৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  وَلَقَدْ ضَرَبْنَا لِلنَّاسِ فِي هَذَا الْقُرْآَنِ مِنْ كُلِّ مَثَلٍ وَلَئِنْ جِئْتَهُمْ بِآَيَةٍ لَيَقُولَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ أَنْتُمْ إِلَّا مُبْطِلُونَ (58) كَذَلِكَ يَطْبَعُ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ (59)

“এবং সত্যিই আমি এই কুরআনে মানুষের জন্য সর্বপ্রকার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছি। এবং আপনি যদি তাদের কাছে কোনো নিদর্শন উপস্থিত করেন, তবে কাফেররা অবশ্যই বলবে, তোমরা সবাই (মিথ্যা বলছো এবং তোমরা) মিথ্যাপন্থি।” (৩০:৫৮) 

“এমনিভাবে আল্লাহ জ্ঞানহীনদের হৃদয় মোহরাঙ্কিত করে দেন।” (৩০:৫৯)

পবিত্র কুরআন হচ্ছে হেদায়েতের গ্রন্থ। মানুষের হেদায়েত ও সৎপথ পাওয়ার জন্য যা কিছু প্রয়োজন তার সবই এই কিতাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সুসংবাদ ও সতর্কতা, হেদায়েত ও পরামর্শ, আদেশ ও নিষেধ, উৎসাহ ও ভর্ৎসনা, যুক্তি ও তর্কসহ মানুষকে সঠিক পথে আনার জন্য যা কিছু প্রয়োজন তার সবই রয়েছে এই মহাগ্রন্থে। পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে আল্লাহর একত্ববাদের কারণ এবং তার ইবাদত করার প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করা হয়েছে। এই মহাগ্রন্থে মানুষের জীবন যাপনের সঠিক পন্থার পাশাপাশি চারিত্রিক খারাপ দিকগুলো থেকে বিরত থাকার উপায় বাতলে দেয়া হয়েছে। সারাদিনে কতোবার কিভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে হবে এবং সারা বছরই বা একজন মুসলমানের কি কি ধর্মীয় কর্তব্য রয়েছে তা এই মহাগ্রন্থে বলে দেয়া হয়েছে। খোদাভীরু ও মুমিন প্রতিটি বান্দার ধর্মীয় বিশ্বাস, অবশ্য পালনীয় হুকুম-আহকাম ও নৈতিক উপদেশাবলী বর্ণিত রয়েছে পবিত্র কুরআনের ছয় হাজারেরও বেশি আয়াতে। এত কিছুর পরও যারা সত্য গ্রহণ করতে ইচ্ছুক নয় তারা অহংকার ও গোঁড়ামির কারণে আল্লাহকে অস্বীকার করে এবং কুরআনে বর্ণিত এতসব নিদর্শনাবলীকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেয়, এমনকি তারা মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের বাণী শুনতেও রাজি নয়।

পরবর্তী আয়াতে খোদাদ্রোহীদের কুফরির কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে: এ ধরনের যেসব অপরাধী কুফরি ও গোনার কাজে অটল থাকে মহান আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেন। ফলে তাদের পক্ষে আর সত্য উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না। তাদের উদাহরণ সেইসব চোরের মতো যাদেরকে চুরির অপরাধে কারাগারে বন্দি করে বাইরে থেকে তালা মেরে রাখা হয়। চুরির অপরাধে বিচারপতি তাদেরকে কারাগারে নিক্ষেপ করতে  বাধ্য হন। ফলে তারা স্বাধীনভাবে উন্মুক্ত পরিবেশে থাকার নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হয়। অবশ্য গোনাহগার ব্যক্তি প্রবল অনুশোচনা থেকে তওবা করলে এবং পাপের পথ চিরতরে পরিত্যাগ করলে মহান আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু সে যদি পাপের পথে অটল থাকে তাহলে তার অন্তরে মোহর মেরে দেয়া হয়; যার ফলে তার পক্ষে আর সত্য উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে সব শ্রেণির মানুষের জন্য। এটি বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান করে যাতে সব শ্রেণি ও বর্ণের মানুষ এই মহাগ্রন্থ থেকে উপকৃত হতে পারে।

২. পাপের পথে অটল থাকা ব্যক্তি সত্যকে মিথ্যা বলে মনে করে। সে নিজেকে মুমিন মনে করে আর মুমিন ব্যক্তিকে তার কাছে পথভ্রষ্ট মনে হয়। কাজেই আমাদেরকে ইসলামের নামে প্রচলিত ভ্রান্ত আকিদাগুলোর ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

৩. কেউ মহান আল্লাহর সঙ্গে কুফরি করলে তার শাস্তি হিসেবে আল্লাহ তায়ালা তাকে সত্য উপলব্ধির ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করেন।

সূরা রুমের ৬০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

فَاصْبِرْ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَلَا يَسْتَخِفَّنَّكَ الَّذِينَ لَا يُوقِنُونَ (60)   

“অতএব, আপনি সবর করুন। (আপনার বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে) আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। এবং যারা (আল্লাহ ও কিয়ামতে) বিশ্বাসী নয় তারা যেন আপনাকে (অসহিষ্ণু ও) বিচলিত করতে না পারে।” (৩০:৬০)

এটি সূরা রুমের শেষ আয়াত। এতে মহান আল্লাহ বলছেন: ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় ঈমানদার ব্যক্তিরা সব সময় কাফেরদের নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। কাজেই আমাদেরকে এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে খোদাদ্রোহী শক্তিগুলোর অসহিষ্ণু আচরণের মোকাবিলায় ধৈর্য ধারণ করতে হবে। সেই সঙ্গে আল্লাহর শত্রুদের হুমকি-ধমকি ও প্রচারণায় বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না। কারণ, আল্লাহ তায়ালা মুমিন বান্দাকে এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, সে সবর করলে ও ধৈর্য ধরলে চূড়ান্ত বিজয় তারই জন্য অপেক্ষা করছে।

আয়াতের পরবর্তী অংশে বিশ্বনবী (সা.) ও ঈমানদার ব্যক্তিদের উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: যদি তোমরা কাফেরদের প্রচারণায় প্রভাবিত হও তাহলে ভয় ও শঙ্কা তোমাদের পেয়ে বসবে। তখন তোমরা ধৈর্যধারণ ও প্রতিরোধ করার পরিবর্তে হীনমন্যতায় ভুগবে এবং মর্যাদা হানিকর কাজ করে বসবে। অথবা সেক্ষেত্রে তোমরা শত্রুদের অবমাননাকর আচরণ ও কথাবার্তায় এতটা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে যে, নিজেদের মনস্তত্বের ওপর তোমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। এ অবস্থায় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এমন কাজে হাত দেবে যার ফলে সমাজে তোমাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ঈমানদার ব্যক্তিকে যেকোনো মূল্যে সঠিক পথে চলা অব্যাহত রাখতে এবং শত্রুদের বিভ্রান্তিকর আচরণ ও কথাবার্তার মোকাবিলায় ধৈর্যধারণ করতে হবে।

২. বেঈমান ও ধর্মহীন ব্যক্তিদের অপপ্রচার যেন আমাদেরকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রভাবিত না পারে। মহান আল্লাহ আমাদেরকেবাতিল শক্তির বিরুদ্ধে বিজয়ের যে প্রতিশ্রুতি  দিয়েছেন তার প্রতি অটল বিশ্বাস রাখতে হবে।

৩. ধৈর্য ধারণ করতে ও সহিষ্ণু হতে না পারলে ঈমানদার ব্যক্তিকেও সমাজে অবমাননাকর অবস্থায় পড়তে হয়।#