ডিসেম্বর ১৩, ২০১৭ ১২:৫৪ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা লুকমানের ২০ থেকে ২৪ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ২০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

أَلَمْ تَرَوْا أَنَّ اللَّهَ سَخَّرَ لَكُمْ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَأَسْبَغَ عَلَيْكُمْ نِعَمَهُ ظَاهِرَةً وَبَاطِنَةً وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يُجَادِلُ فِي اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَلَا هُدًى وَلَا كِتَابٍ مُنِيرٍ (20)

“তোমরা কি দেখ না আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, তার সবই আল্লাহ তোমাদের সেবায় নিয়োজিত করে দিয়েছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নেয়ামতসমূহ পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন? এমন লোকও আছে; যারা জ্ঞান, পথনির্দেশ ও সুস্পষ্ট কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্পর্কে বাকবিতণ্ডা ও তর্ক করে।” (৩১:২০)

ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিকতা ও সামাজিক বিষয়াদি সম্পর্কে হযরত লুকমান (আ.) নিজ সন্তানের প্রতি যেসব উপদেশ দিয়েছেন সে সম্পর্কিত আলোচনা গত আসরে শেষ হয়েছে।  আজকের এই আয়াতে আল্লাহকে চেনার উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে: মহান আল্লাহ  আকাশ ও ভূমি সৃষ্টি করে এর মধ্যবর্তী সবকিছু এমনভাবে বিন্যস্ত করেছেন যাতে সেগুলো সব সময় মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকে।  আকাশে চন্দ্র ও সূর্যের উপস্থিতি এবং নিজ অক্ষের ওপর ও সূর্যের কক্ষপথে পৃথিবীর ঘুর্ণনের ফলে ভূপৃষ্ঠে মানুষের বসবাস উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সাগর-মহাসাগর, ভূপৃষ্ঠে ও ভূগর্ভের নানা প্রকার খনিজ সম্পদ, জল ও স্থলের নানা জীবজন্তু ও প্রাণী, গাছপালা ও কৃষিপণ্য ইত্যাদি সবই আল্লাহতায়ালা মানুষের সেবায় নিয়োজিত করে দিয়েছেন। এসবের কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ তিনি মানুষের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন এবং বাকি সব কিছুই মানুষের কল্যাণের লক্ষ্যে তিনি নিজেই পরিচালনা করছেন।

মহান আল্লাহ শুধু মানুষের বস্তুগত চাহিদাই পূরণ করেননি সেইসঙ্গে তার আত্মিক চাহিদা পূরণ এবং চলার পথের দিশা দিতে যুগে যুগে পাঠিয়েছেন বহু নবী ও রাসূল। মানুষ যাতে দিকহারা হয়ে না যায় এবং আত্মিক দিক দিয়ে পূর্ণতায় পৌঁছাতে পারে সে ব্যবস্থা করেছেন দয়ালু আল্লাহ।  কিন্তু সব যুগে সব সময়ে এমন কিছু মানুষ ছিল এবং আছে যারা আল্লাহর এসব নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় না করে তাঁর সম্পর্কে অযথা তর্কে লিপ্ত হয়। এসব মানুষের কোনো যুক্তি না থাকা সত্ত্বেও তারা গায়ের জোরে ঈমানদারদের সঙ্গে তর্ক করে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো-

১. এই বিশ্বজগতের মূল আকর্ষণ হচ্ছে মানুষ। আকাশ ও জমিনের বাকি সবকিছু সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষেরই কল্যাণে।

২. মানুষের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত যেমন প্রচুর পরিমাণে রয়েছে তেমনি তার বৈচিত্রও অনেক। এরপরও আল্লাহর প্রতি মানুষের অকৃতজ্ঞতা কাম্য নয়।

৩. আমাদের উচিত জ্ঞান-বুদ্ধি ও যুক্তিনির্ভর আলোচনা করা।  অথবা আল্লাহ প্রদত্ত কিতাবের শিক্ষাকে দলিল হিসেবে তুলে ধরেও আলোচনা হতে পারে। 

সূরা লুকমানের ২১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آَبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ الشَّيْطَانُ يَدْعُوهُمْ إِلَى عَذَابِ السَّعِيرِ (21)   

“তাদেরকে যখন বলা হয়, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তোমরা তার অনুসরণ কর, তখন তারা বলে, (না) আমরা বরং আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে যে বিষয়ের উপর পেয়েছি, তারই অনুসরণ করব। শয়তান যদি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির দিকে দাওয়াত দেয়, তবুও কি (তারা তার অনুসরণ করবে)?”(৩১:২১)

এর আগের আয়াতে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর অস্তিত্বের ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে কিংবা আল্লাহকে সরাসরি অস্বীকার করে তারা নিজেদের বক্তব্যের পক্ষে কোনো অকাট্য যুক্তি তুলে ধরতে পারে না।  আর এই আয়াতে বলা হচ্ছে, কাফেরদের অনেকে যে খোঁড়া যুক্তিটি দেখায় তা হচ্ছে- তারা তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্ম অনুসরণ করছে। তারা ভুল হচ্ছে জেনেও নিজেদের বাপ-দাদার ধর্মীয় বিশ্বাস ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয়। এ কারণে এ ধরনের মানুষ তাদের পূর্বপুরুষদের মতো নিজেরাও জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে-

১. পূর্বপুরুষদের ভুল বিশ্বাসকে অন্ধভাবে অনুসরণ মানুষের সত্য গ্রহণের পথে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে।

২. সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং জাতীয় কৃষ্টি-কালচার ততক্ষণ পর্যন্ত সমুন্নত রাখা যাবে যতক্ষণ তা ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়। এর বিপরীত হলে সে ঐতিহ্য একটি জাতির জন্য ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।

৩. শয়তান সব সময় মানুষকে মিথ্যা ও বক্র পথে পরিচালিত হওয়ার জন্য কুমন্ত্রণা দিতে থাকে।

সূরা লুকমানের ২২ থেকে ২৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

) وَمَنْ يُسْلِمْ وَجْهَهُ إِلَى اللَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى وَإِلَى اللَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ (22) وَمَنْ كَفَرَ فَلَا يَحْزُنْكَ كُفْرُهُ إِلَيْنَا مَرْجِعُهُمْ فَنُنَبِّئُهُمْ بِمَا عَمِلُوا إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ (23) نُمَتِّعُهُمْ قَلِيلًا ثُمَّ نَضْطَرُّهُمْ إِلَى عَذَابٍ غَلِيظٍ (24)

“যে ব্যক্তি সৎকর্মপরায়ণ হয়ে স্বীয় মুখমণ্ডলকে আল্লাহ অভিমূখী করে, সে এক মজবুত হাতল ধারণ করে, সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর দিকে।” (৩১:২২)     

“যে ব্যক্তি কুফরি করে তার কুফরি যেন আপনাকে চিন্তিত না করে। আমারই দিকে সবার প্রত্যাবর্তন, অতঃপর আমি তাদের কর্ম সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত করব। (মানুষের) অন্তরে যা কিছু রয়েছে, সে সম্পর্কে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত।” (২৩১:২৩)  

“আমি তাদেরকে স্বল্পকালের জন্যে ভোগবিলাস করতে দেব, অতঃপর তাদেরকে বাধ্য করব গুরুতর শাস্তি ভোগ করতে।” (৩১:২৪)

এই তিন আয়াতে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদের দাওয়াতের সামনে মানবজাতিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এদের মধ্যে একদল তাদের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে আল্লাহর সামনে নিজেদেরকে পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পন করে। আর অন্যদল একত্ববাদের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে মুখ ঘুরিয়ে বাঁকা পথে চলে যায়। তারা এক আল্লাহকে অস্বীকার বা কুফরি করে। প্রথম দল ঐশী হেদায়েতের রশি শক্তভাবে ধারণ করে সঠিক পথের দিশা পেয়ে যায়। তাদের মাধ্যমে মানবজাতি উপকৃত হয়। মানুষের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ দেখিয়ে তারা আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহভাজন হয়ে যায় এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে অপেক্ষা করছে মহা পুরস্কার। কিন্তু দ্বিতীয় দল এই ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের কিছু ভোগসামগ্রী পেলেও তাদের চূড়ান্ত পরিণতি শুভ হয় না।  দুনিয়া ও আখেরাতে তাদেরকে খারাপ পরিণতি ভোগ করতে হয়।

কিন্তু সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত আল্লাহর রাসূল কাফেরদের এই দুঃখজনক পরিণতির কথা ভেবে কষ্ট পেতেন। কাফেররা তাঁকে নানাভাবে কষ্ট দেয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ উল্টো তাদের জন্য আফসোস করতেন। তিনি চাইতেন সব মানুষ আল্লাহর দ্বীনের পথে এসে জান্নাতবাসী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করুক।  কিন্তু যারা সব ধরনের নিদর্শন উপলব্ধি করা সত্ত্বেও আল্লাহকে অস্বীকার করে তাদেরকে ঈমানের পথে আনতে বাধ্য করা বিশ্বনবীর পক্ষে সম্ভব ছিল না।  এজন্য মহান আল্লাহ বিশ্বনবী (সা.)কে দুঃখ ও পরিতাপ করতে নিষেধ করেছেন।

এই তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১. বিশ্বের সকল সৃষ্টি যখন আল্লাহর তায়ালার নির্দেশের কাছে আত্মসমর্পন করেছে এবং মহান আল্লাহ সেসব সৃষ্টিকে আমাদের সেবায় নিয়োজিত করে দিয়েছেন তখন আমরা কেন তাঁর নির্দেশের সামনে নিজেদেরকে সঁপে দেব না?

২. মানুষ পার্থিব জীবনে নিজের অবস্থান ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও বস্তুর শরণাপন্ন হয়। তারা ভাবে এসব ব্যক্তি ও অবলম্বন তাদেরকে সব ধরনের বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু মুমিন ব্যক্তি নির্ভর করে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার ওপর এবং তিনি হচ্ছেন সবচেয়ে বড় নির্ভরতার স্থান। তারা আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধরে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করার মাধ্যমে মুক্তির পথ অন্বেষণ করে।  হাদিসে এসেছে, নবী-রাসূল এবং ইমামগণও ছিলেন আল্লাহর রজ্জু।

৩. এই বিশ্বজগতের ভবিষ্যতের কথা গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করে পার্থিব জীবনে আমাদেরকে নিজেদের চলার পথ বেছে নিতে হবে যাতে জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে অনুশোচনায় পড়তে এবং কঠিন পরিণতির শিকার হতে না হয়।#