ডিসেম্বর ৩০, ২০১৭ ১৮:২০ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা লুকমানের ২৯ থেকে ৩৪ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ২৯ ও ৩০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يُولِجُ اللَّيْلَ فِي النَّهَارِ وَيُولِجُ النَّهَارَ فِي اللَّيْلِ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلٌّ يَجْرِي إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى وَأَنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ (29) ذَلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ الْبَاطِلُ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ (30)

“তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহ রাত্রিকে দিবসে প্রবিষ্ট করেন এবং দিবসকে রাত্রিতে প্রবিষ্ট করেন? তিনি চন্দ্র ও সূর্যকে কাজে নিয়োজিত করেছেন; প্রত্যেকেই নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত পরিভ্রমণ করে। তুমি কি আরও দেখ না যে, তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন?”(৩১:২৯)

“(এসব বিষয়) এটাই প্রমাণ (করে) যে, আল্লাহ-ই সত্য এবং তিনি ব্যতীত তারা যাদের পূজা করে সব মিথ্যা। আল্লাহ সুউচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, সুমহান।” (৩১:৩০)      

আগের আয়াতগুলোর ধারাবাহিকতায় এই দুই আয়াতে বিশ্বজগত সৃষ্টিতে মহান আল্লাহর আরো কিছু নিদর্শনের প্রতি ইঙ্গিত করে বিশ্বনবী (সা.) ও মুমিনদের উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: চন্দ্র ও সূর্যকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে আবর্তনের মাধ্যমে দিন ও রাতের সৃষ্টি এবং ঋতুর পরিবর্তন মহান আল্লাহই ঘটান। তিনিই চন্দ্র ও সূর্যকে নির্ধারিত কাজে নিয়োজিত করে দিয়েছেন। আল্লাহর ইচ্ছায় দিন ও রাত্রির একের পর এক আবির্ভাব সম্ভব হয়েছে যা মানুষসহ সব প্রাণী ও উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। আয়াতের পরের অংশে বলা হচ্ছে, দিন ও রাতের এই আবর্তন চিরস্থায়ী নয়। এর জন্য আল্লাহ নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তিনি যেদিন ইচ্ছা করবেন সেদিন এই বিশ্বজগতের সব নিয়মকানুন ওলটপালট হয়ে কিয়ামত সংঘটিত হবে। তখন দিবারাত্রির এই আবর্তন বর্তমান সময়ের মতো থাকবে না।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. সৃষ্টিরহস্য ও প্রাকৃতিক ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালাকে চেনা সম্ভব। পবিত্র কুরআন এ বিষয়ের প্রতি বারবার তাগিদ দিয়েছে।

২. চন্দ্র, সূর্য ও পৃথিবীর ঘূর্ণন একটি নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত চলবে। বর্তমান বিশ্বজগত একদিন শেষ হয়ে যাবে; যেদিনের খবর একমাত্র মহান আল্লাহ জানেন।

৩. আল্লাহ তায়ালা হচ্ছেন চিরস্থায়ী সত্য। তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।  তিনি ছাড়া আর সবকিছু ধ্বংসশীল।

সূরা লুকমানের ৩১ ও ৩২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

أَلَمْ تَرَ أَنَّ الْفُلْكَ تَجْرِي فِي الْبَحْرِ بِنِعْمَةِ اللَّهِ لِيُرِيَكُمْ مِنْ آَيَاتِهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ (31) وَإِذَا غَشِيَهُمْ مَوْجٌ كَالظُّلَلِ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ فَلَمَّا نَجَّاهُمْ إِلَى الْبَرِّ فَمِنْهُمْ مُقْتَصِدٌ وَمَا يَجْحَدُ بِآَيَاتِنَا إِلَّا كُلُّ خَتَّارٍ كَفُورٍ (32)

“তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহর অনুগ্রহে জাহাজ সমুদ্রে চলাচল করে, যাতে তিনি তোমাদেরকে তাঁর (ক্ষমতার কিছু) নিদর্শন প্রদর্শন করেন? নিশ্চয় এতে প্রত্যেক সহনশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্যে নিদর্শন রয়েছে।” (৩১:৩১)

“যখন তাদেরকে মেঘমালা সদৃশ (বিক্ষুব্ধ) তরংগ আচ্ছাদিত করে, তখন তারা খাঁটি মনে আল্লাহকে ডাকতে থাকে। অতঃপর তিনি যখন তাদেরকে স্থলভাগের দিকে উদ্ধার করে আনেন, তখন তাদের কেউ কেউ সরল পথে চলে (এবং বাকিরা বাঁকা পথে চলে যায়) কেবল মিথ্যাচারী, অকৃতজ্ঞ ব্যক্তিই আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করে।” (৩১:৩২)

আগের আয়াতগুলোর ধারাবাহিকতায় এই দুই আয়াতে বিশ্বজগত ও মানুষের মধ্যে মহান আল্লাহর দুটি নিদর্শনের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: পানিতে জাহাজ চলাচল এবং এর মাধ্যমে যাত্রী ও পণ্য পরিবহণে আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে গাড়ি, ট্রেন ও বিমানের মতো আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এখনো সবচেয়ে বেশি পণ্য পরিবহণ করা হয় সাগরে চলাচলকারী জাহাজের মাধ্যমে। কারণ, সাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশি বিনা খরচে মানুষকে চলাচলের সুবিধা করে দিয়েছে।

এই সাগরপথে বিশ্বের এক প্রান্তের সঙ্গে আরেক প্রান্তের যোগাযোগ স্থাপিত হচ্ছে।  সাগর ও মহাসাগরগুলো নরম কার্পেটের মতো মানুষের পায়ের নীচে নিজেকে সঁপে দিয়েছে যাতে স্থল ও আকাশপথের চেয়ে বেশি সহজে সে একস্থান থেকে আরেক স্থানে পণ্য ও মালামাল পরিবহন করতে পারে।

সাগরের এই নেয়ামতের কথা বর্ণনা করার পর পবিত্র কুরআন সাগরে সংঘটিত একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে যার মাধ্যমে মানুষ সহজাতভাবেই আল্লাহকে চিনতে পারে। বলা হচ্ছে: সাগরে তুফান উঠলে যখন বিশাল বিশাল ঢেউ জাহাজকে গ্রাস করে ফেলবে বলে মনে হয় তখন এর যাত্রীরা নিজেদেরকে মৃত্যুর মুখোমুখি দেখতে পায়। এ সময় তারা বেঁচে থাকার আশা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু মনের অজান্তে তারা এমন এক সত্ত্বার উপস্থিতি অনুভব করে যিনি তাদেরকে এই মহা বিপদ থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম।  এ অবস্থায় তারা খাঁটি মনে আল্লাহকে ডাকে এবং বাঁচার জন্য তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করে।  কিন্তু অকৃতজ্ঞ মানুষেরা এই তুফানের বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে তীরে পৌঁছানোর পর তাদের মুক্তিদাতার কথা ভুলে যায়, এমনকি অনেকে তাঁকে অস্বীকারও করে বসে।  তবে অনেক মানুষ আছে যারা এ ধরনের বিপদের মুখোমুখি হওয়ার পর সত্যিকার অর্থে আল্লাহকে চিনতে পারে, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করে এবং প্রবল ঈমানিশক্তি নিয়ে তাঁর ইবাদতে মগ্ন হয়ে যায়।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. আল্লাহর সৃষ্টিগুলো গভীর মনযোগ দিয়ে প্রত্যক্ষ করতে হবে। সাগর, মহাসাগর ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদির দিকে তাকালে আল্লাহর নিদর্শন উপলব্ধি করা ও তাঁকে চেনা সহজ হয়।

২. মানুষ সহজাতভাবে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু বস্তুগত জীবনের মোহ মানুষের চোখের সামনে এমন একটি আবরণ তৈরি করে দেয় যার ফলে সে আল্লাহকে দেখতে পায় না।  বড় ধরনের বিপদ-আপদে পড়লে মানুষের চোখের সামনের সে আবরণ খুলে যায় এবং সে একমাত্র আল্লাহকে নিজের মুক্তিদাতা হিসেবে দেখতে পায়। তখন সে একনিষ্ঠ চিত্তে আল্লাহকে স্মরণ করে।

৩. কিছু মানুষের ঈমান স্থায়ী ও টেকসই। কিন্তু অপর একদল মানুষের ঈমান সাময়িক এবং মৌসুমি বায়ুর মতো। এখন আছে তো তখন নেই।

সূরা লুকমানের ৩৩ ও ৩৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

   يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ وَاخْشَوْا يَوْمًا لَا يَجْزِي وَالِدٌ عَنْ وَلَدِهِ وَلَا مَوْلُودٌ هُوَ جَازٍ عَنْ وَالِدِهِ شَيْئًا إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُمْ بِاللَّهِ الْغَرُورُ (33) إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَاذَا تَكْسِبُ غَدًا وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ (34)

“হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর এবং ভয় কর এমন এক দিবসকে, যখন পিতা পুত্রের কোন কাজে আসবে না এবং পুত্রও তার পিতার কোন উপকার করতে পারবে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহর ওয়াদা সত্য। অতএব, পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে ধোঁকা না দেয় এবং আল্লাহর ক্ষমা সম্পর্কে প্রতারক শয়তানও যেন তোমাদেরকে প্রতারিত না করে।” (৩১:৩৩)

“নিশ্চয় একমাত্র আল্লাহর কাছেই কেয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং (মায়ের) গর্ভাশয়ে যা থাকে, তিনি তা জানেন। কেউ জানে না আগামীকাল সে কি উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন দেশে সে মৃত্যুবরণ করবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।” (৩১:৩৪)

এই দুই আয়াতে মানুষকে তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জনের আহ্বান জানিয়ে এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে: পৃথিবীর নানা সমস্যায় পরিবারের সদস্যরা একে অপরকে উপকার করতে পারলেও কিয়ামতের দিন একজন আরেকজনের কোনো উপকারে আসবে না। পিতার পক্ষে পুত্রকে কিংবা পুত্রের পক্ষে পিতাকে সাহায্য করা সম্ভব হবে না। কাজেই পারিবারিক সম্পর্কের মোহ কিংবা অহংকার যেন আমাদের পেয়ে না বসে এবং আমরা যেন না ভাবি, ঈমান ও নেক আমল ছাড়াই আমরা কিয়ামতের দিন নিকটাত্মীয়দের সাহায্যে পার পেয়ে যাব। কিয়ামতের দিন আমাদেরকে এমন এক সত্ত্বার সামনে দাঁড়াতে হবে যিনি আমাদের প্রকাশ্য ও গোপন সব খবর জানেন।  কিয়ামত কবে সংঘটিত হবে, মানুষ কবে কোথায় মারা যাবে কিংবা মায়ের গর্ভের ভ্রুণের কি অবস্থা তা কেবল আল্লাহই জানেন।

এখানে বলা প্রয়োজন যে, মায়ের গর্ভে কি আছে সে সম্পর্কিত জ্ঞান ভ্রুণের লিঙ্গ নির্ধারণের মধ্যেই সীমিত নয়। বরং এই ভ্রুণের মেধা, মনন এবং তার ভবিষ্যতসহ আরো হাজারটা বিষয় আছে যা মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। এই আয়াতে সে সম্পর্কিত জ্ঞানের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।  সার্বিকভাবে মানুষ যেন কখনোই একথা না ভাবে যে, তার গোপন কার্যকলাপ সম্পর্কে মহান আল্লাহ অবহিত নন।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. কিয়ামতের দিন পারিবারিক সম্পর্ক কোনো কাজে আসবে না।  পিতা যখন পুত্রের কাজে আসবে না তখন অন্য আত্মীয়দের অবস্থা কি হবে তা সহজেই অনুমেয়।

২. কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে, তবে কবে হবে তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। তেমনি আমাদের মৃত্যুও অবধারিত, তবে আমরা শুধু এর দিন-তারিখ জানি না।  মহান আল্লাহই এ সম্পর্কে সম্যক অবহিত।

৩. দুনিয়ার চাকচিক্য আমাদেরকে কিয়ামত সম্পর্কে উদাসিন করে রাখে। তবে যারা এই চাকচিক্যকে উপেক্ষা করতে পারবে  তারাই কিয়ামতের দিন সফলকাম হবে।।#