রমজান : রহমতের বসন্ত (পর্ব -২৫)
আশা করছি এ আলোচনা আমাদের হৃদয়ে যোগাবে আত্ম-উন্নয়নের প্রবল উদ্যম ও প্রাণশক্তি। হে সর্বোচ্চ দয়াময়! মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি দরুদ পাঠানোর উসিলায় এই রমযান যেন আমাদের জন্য হয়ে ওঠে আত্ম-সংশোধন ও উন্নয়ন এবং দুনির্বার খোদাপ্রেমের ফল্গুধারা।
দোয়া, দরুদ, তওবা, কুরআন অধ্যয়ন ও সার্বিকভাবে আত্ম-সংশোধন ও ইবাদতের বসন্ত হল রমজান। মহান আল্লাহ অনুতপ্ত পাপীকে খুবই ভালবাসেন। অহংকারী পুণ্যবানের সব সৎকর্ম পণ্ডশ্রম হয়ে পড়ে। অন্যদিকে তওবার কারণে পাপীর অসৎ কর্মগুলো সৎকর্মের রূপ নেয় এবং সেসবই সাওয়াবে পরিণত হয়। তওবা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলেই মহানবীর (সা) মত নিষ্পাপ মহামানবও দৈনিক শত শত বার তওবা করতেন। কোনো মজলিশ থেকে ওঠার পর তিনি বহুবার ইস্তিগফার করতেন তথা তওবা করতেন।
নৈতিক বিষয়ের শিক্ষকরা বলেন, বস্তুগত বিষয়ে প্রত্যেক মানুষের উচিত তার চেয়ে দরিদ্রদের দিকে লক্ষ্য রাখা এবং আধ্যাত্মিক বিষয়ে বেশি খোদাভীরু ও ধার্মিকদের দিকে লক্ষ্য রাখা। শেখ সাদি যৌবন বা কৈশোরে একবার খুবই আফসোস করছিলেন জুতার দোকানে খুব সুন্দর জুতা দেখে। কারণ তার জুতা ছিল না ও তা কেনারও সাধ্য ছিল না। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই দেখলেন যে এক ব্যক্তি খুব কষ্ট করে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। কারণ লোকটির একটি পা অচল হয়ে পড়েছিল! এ অবস্থায় শেখ সাদি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানালেন যে তার অন্তত দুটো সচল পা রয়েছে।
একজন উচ্চস্তরের খোদাভীরু আলেমকে বলা হল: আপনি তো খুবই আমানতদার ও বিশ্বস্ত! তিনি জবাবে বলেন, কাশানের উট বা ঘোড়ার চালকরাও তো কত বিশ্বস্ত! তারাও নির্দিষ্ট ঠিকানায় মানুষের মালামাল পৌঁছে দেয় এবং বিন্দুমাত্র পণ্যও বা শস্যও কম দেয় না! বিনয়ে অভ্যস্ত মানুষ এবং সৎ ও ধার্মিক মানুষরা অন্যদেরকে নিজের চেয়েও সৎ ও ধার্মিক মনে করেন। অন্যদিকে অসৎ মানুষেরা ভাবেন যে অন্য অনেকে তাদের চেয়েও বেশি অসৎ! একবার এক অহংকারী আলেম এক মন্দ স্বভাবের নারীকে বলছিলেন, তোমার পোশাক আর চালচলনে স্বভাবের কদর্যতা ফুটে উঠেছে! ওই নারী বলল, হ্যাঁ! আমি খারাপ নারী তা দেখেই বোঝা যায়! কিন্তু আপনি বাহ্যিকভাবে যেমন আপনার ভেতরটাও কি তেমনই পবিত্র ও সুন্দর? এ কথায় আলেম লজ্জা পেলেন এবং অহংকার প্রকাশের জন্য ক্ষমা চাইলেন। একজন প্রকৃত ধার্মিককে হতে হবে ভেতরে ও বাইরে অভিন্ন। তিনি অন্যদের যা বলবেন সবার আগে তা নিজের মধ্যেই থাকতে হবে। নিজে মিষ্টি বেশি খেতে অভ্যস্ত হয়েও অন্যদের মিষ্টি কম খেতে বললে তা হবে কপটতা এবং তাতে প্রভাবও পড়বে খুব কম।
জ্ঞানহীন যন্ত্রের মত প্রাণহীন ইবাদত যতই বেশিই হোক না কেন এমন লাখ লাখ বছরের ইবাদতের চেয়ে কয়েক মুহূর্তের জ্ঞান-সাধনা ও গবেষণাসুলভ চিন্তা-ভাবনা মহান আল্লাহর কাছে অনেক বেশি প্রিয়। আসলে জ্ঞান-বিবর্জিত প্রাণহীন ইবাদত আল্লাহর দরবারে গ্রহণ করাই হয় না। একজন খোদাপ্রেমিক ও খোদাভীরু মানুষকে খবর রাখতে হবে বিশ্ব-পরিস্থিতির ও দূরদৃষ্টি আর বিচক্ষণতা রাখতে হবে মানবজাতির শত্রুদের নানা ষড়যন্ত্র সম্পর্কে। ব্যক্তি-জীবন, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও চিন্তা আর বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সংকট আর নানা জরুরি প্রশ্ন বা সন্দেহের উত্তর জানার জন্য তাকে সব সময় সচেষ্ট হতে হবে। যে ব্যক্তি মুসলমান হয়েও অন্য মুসলমানদের নানা সংকট, সমস্যা ও প্রতিবেশীদের নানা বিপদ সম্পর্কে উদাসীন থাকে মহানবীর দৃষ্টিতে সে সত্যিকারের মুসলমানই নয় এবং বাস্তব অর্থে সে প্রকৃত মানুষও নয়।
ফিলিস্তিন, মিয়ানমার ও ইয়েমেনসহ বিশ্বের নানা অঞ্চলের নির্যাতিতদের ব্যাপারে উদাসীন থেকে কি ভালো মানুষ, ভালো রোজাদার ও মুসলমান হওয়া সম্ভব? অথচ কুরআন বলছে: "তোমাদের কি হয়েছে, কেন তোমরা আল্লাহর পথে সেসব অসহায় নর-নারী ও দুঃস্থ শিশুদের বাঁচানোর জন্য সংগ্রাম কর না যারা অধিকার হারিয়েছে ও নির্যাতনে কাতর হয়ে ফরিয়াদ করছে,"হে আমাদের মালিক। জালিমের এই জনপদ থেকে বের করে আমাদের অন্য কোথাও নিয়ে যাও এবং তোমার পক্ষ থেকে অভিভাবক পাঠিয়ে দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে সাহায্যকারী পাঠাও।" আল-কুরআন: সুরা নিসাঃ ৭৫
আজ আজ রমজানের শেষ শুক্রবার তথা বিশ্ব-কুদস দিবস। মুসলমানদের প্রথম কিবলার শহর বায়তুল মুকাদ্দাসকে ইহুদিবাদী ইসরাইলের দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করতে আজ বিশ্বের বহু দেশে ইসরাইল-বিরোধী সভা-সমাবেশ ও মিছিল হচ্ছে। ইসরাইল ও মার্কিন-বিরোধী নানা শ্লোগানের পাশাপাশি খোদ ফিলিস্তিনে ইসরাইলের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন ঘোষণাকারী সৌদি সরকারের বিরুদ্ধেও নানা শ্লোগান দেয়া জরুরি।
এবার এমন সময় বিশ্ব-কুদস দিবস পালন করা হচ্ছে যখন মার্কিন সরকার পূর্ব বায়তুল মুকাদ্দাস তথা জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পর গোটা ফিলিস্তিনকে ইসরাইলের অংশে পরিণত করার জন্য ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি নামক ষড়যন্ত্রকে এগিয়ে নেয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সিরিয়ার গোলানকেও ইসরাইলের অংশ বলে অবৈধ এক ঘোষণা দিয়েছেন।
বিশ্ব-কুদস দিবসের প্রবর্তক মরহুম ইমাম খোমেনী এ দিবসকে ইসলামের দিবস বলে ঘোষণা করেছিলেন। এটা খুবই লজ্জাজনক যে মুসলিম নেতাদের অনৈক্যের কারণে ইসলামের প্রথম কিবলা এখনও ইসরাইলের অবৈধ দখলে রয়েছে।
এটা স্পষ্ট কথিত আপোষকামী ফিলিস্তিনি ও আরব নেতাদের সামনেও ন্যায্য অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে সংগ্রামের পথ ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই এবং নেই শান্তি বা সংলাপের নামে বিশ্বাসঘাতকতা বজায় রাখার কোনো অজুহাত। মহান আল্লাহর ইচ্ছায় ফিলিস্তিন আবারও মুসলমানদের হাতে ফিরে আসবে যদি তারা ইসলাম ও জিহাদের পথ অব্যাহত রাখে। এবারে শোনা যাক অর্থসহ ২৫ তম রোজার দোয়া:
الیوم الخامس والعشرون : اَللّـهُمَّ اجْعَلْنی فیهِ مُحِبَّاً لاَِوْلِیائِکَ، وَمُعادِیاً لاَِعْدائِکَ، مُسْتَنّاً بِسُنَّةِ خاتَمِ اَنْبِیائِکَ، یا عاصِمَ قُلُوبِ النَّبِیّینَ .
হে আল্লাহ ! এ দিনে আমাকে তোমার বন্ধুদের বন্ধু এবং তোমার শত্রুদের শত্রু করে দাও। তোমার আখেরী নবীর সুন্নত ও পথ অনুযায়ী চলার তৌফিক আমাকে দান কর। হে নবীদের অন্তরের পবিত্রতা রক্ষাকারী। #
পার্সটুডে/এমএএইচ/৩১