সূরা সোয়াদ: আয়াত ৮৪-৮৮ (পর্ব-১৫)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা সোয়াদের ৮৪ থেকে ৮৮ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৮৪ ও ৮৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
قَالَ فَالْحَقُّ وَالْحَقَّ أَقُولُ (84) لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنْكَ وَمِمَّنْ تَبِعَكَ مِنْهُمْ أَجْمَعِينَ (85)
“(আল্লাহ) বললেন: “তাই ঠিক, আর আমি সত্য বলছি-(যে)” (৩৮:৮৪)
“তোর দ্বারা আর তাদের মধ্যে যারা তোর অনুসরণ করবে তাদের দ্বারা আমি জাহান্নাম পূর্ণ করব।” (৩৮:৮৫)
গত আসরে আমরা বলেছি, ইবলিসকে যখন আল্লাহর দরবার থেকে বহিষ্কার করা হয় তখন সে আল্লাহ তায়ালার ইজ্জতের কসম খেয়ে ঘোষণা করে, যতদিন জীবিত থাকবে ততদিন সে প্রতিশোধ গ্রহণের লক্ষ্যে আদম সন্তানদের পথভ্রষ্ট করে যাবে। আজকের এই দুই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইবলিসের ওই ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, বাস্তবতা হচ্ছে শুধুমাত্র যারা তোকে অনুসরণ করবে এবং তোর ধোঁকাবাজি ও প্রতারণার ফাঁদে পা দেবে তারাই কেবল পথভ্রষ্ট হবে। তাদেরকে কিয়ামতের দিন জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। কিন্তু যারা বিবেক-বুদ্ধিকে কাজে লাগাবে এবং আমার বিধিনিষেধ মেনে চলবে তারা তোর ধোকায় পড়বে না। তারা তোকে অনুসরণের পরিবর্তে নবী-রাসূলদের অনুসরণ করবে এবং তাদের সত্যবাণী মেনে চলবে। কিয়ামতের দিন তাদের গন্তব্য হবে ভিন্ন এবং তারা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।
এই দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:
১- মহান আল্লাহ নিজে যেমন সত্য তেমনি তাঁর বক্তব্যও সত্য। ঈমানদার মানুষেরা আল্লাহ তায়ালার প্রতিটি কথাকে মহাসত্য বলে বিশ্বাস করে ও মেনে চলে।
২- কিয়ামতের দিন প্রত্যেক দল বা গোষ্ঠী তাদের সমভাবাপন্ন দলগুলোর সঙ্গে পুনরুত্থিত হবে। নেককার বান্দারা নেককারদের সঙ্গে এবং বদকাররা খারাপ লোকদের সঙ্গে থাকবে। নেককার বা সৎকর্মশীলদের গন্তব্য হবে জান্নাত এবং বদকার বা পাপী ব্যক্তিদের গন্তব্য হবে জাহান্নাম।
সূরা সোয়াদের ৮৬ থেকে ৮৮ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন:
قُلْ مَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُتَكَلِّفِينَ (86)
“(হে নবী) আপনি বলুন: আমি আমার (রিসালাতের দায়িত্ব পালনের জন্য) তোমাদের কাছ থেকে কোনো পুরস্কার চাই না এবং আমি তাদের মতোও নই যারা নিজেরা কোনো কিছু সৃষ্টি করে (তা আল্লাহর নামে চালিয়ে দেয়)।”(৩৮:৮৬)
“এই (কুরআন) বিশ্ববাসীর জন্য উপদেশ ছাড়া আর কিছু নয়।”(৩৮:৮৭)
“এবং নিঃসন্দেহে কিছুকাল পরে এর খবর তোমরা জানতে পারবে।”(৩৮:৮৮)
সূরা সোয়াদের এই শেষ তিন আয়াতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও অতি জরুরি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। বিশ্বনবী (সা.)’র নবুওয়াতপ্রাপ্তি এবং পবিত্র কুরআন নাজিলের উদ্দেশ্য এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। নবুয়্যাতের মিথ্যা দাবিদাররা সাধারণত বস্তুগত স্বার্থে ধন-সম্পদ অর্জনের লক্ষ্যে নিজেদেরকে নবী বলে দাবি করে। কিন্তু তাদের বিপরীতে যুগে যুগে সব নবী-রাসূল এবং আমাদের প্রিয় নবীজি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে জনগণের কাছ থেকে কোনো কিছু আশা করেন না। ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা বা কোনো উঁচু পদ এমনকি মানুষের প্রশংসা বা কৃতজ্ঞতারও মুখাপেক্ষী তারা নন। তাঁরা শুধু আল্লাহ তায়ালার বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পালন করেন। আল্লাহর বাণীতে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন বা পরিবর্ধন তারা আনেন না।
অথচ কিছু বিভ্রান্ত মানুষ দাবি করে, নবী-রাসূলগণ ভালো মানুষ ছিলেন কিন্তু তারা তাদের দাওয়াতের বাণীকে আল্লাহর নামে চালিয়ে দিতেন। মানুষ যাতে তাদের কথা মেনে নেয় সেজন্য তারা অজুহাত হিসেবে আল্লাহর নাম ব্যবহার করতেন। বিভ্রান্ত মানুষদের এই দাবির কোনো ভিত্তি নেই।
বাস্তবতা হচ্ছে, সাধারণ মানুষদের সঙ্গে নবী-রাসূলদের কথা ও আচরণ এমন ছিল যে, কাফির-মুশরিকরা পর্যন্ত তাদের জীবনে কোনো খুঁত ধরার সুযোগ পেত না। কাফিররা সারাক্ষণ নবী-রাসূলদের কথা ও আচরণে ত্রুটি বের করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকত। কিন্তু তারা কখনোই এই কাজে সফল হয়নি। প্রকৃত অর্থেই নবী-রাসূলগণ শুধুমাত্র আল্লাহর দাওয়াতের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন এবং এ কাজে তাদেরকে অসহ্য যন্ত্রণা ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে; এমনকি অনেক নবী কাফির-মুশরিকদের হাতে শাহাদাতবরণ করেছেন।
এই তিন আয়াতে আরো বলা হচ্ছে: পৃথিবীতে নবী-রাসূল এবং আসমানি কিতাব পাঠানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে উদাসীনতার অন্ধকার থেকে বের করে আলোর পথ দেখানো। পার্থিব জীবনের প্রতি মোহ এবং এই জীবনের চাকচিক্যের প্রতি আকর্ষণের কারণে মানুষ মৃত্যু পরবর্তী জীবনের কথা সম্পূর্ণ ভুলে যায়। তাদেরকে সেই ভুলের জগত থেকে মুক্তি দিতেই নবী-রাসূলগণ আগমন করেছেন। অথচ দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, কথিত প্রগতীবাদীরা মানবদরদী এই নবী-রাসূলগণকে মানুষের শত্রু হিসেবে তুলে ধরার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালায়।
সূরা সোয়াদের শেষ আয়াতে বিরুদ্ধবাদীদের উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: যদি তোমরা কুরআনের কথায় কান না দিয়ে ঈমান আনা থেকে বিরত থাকো তাহলে শিগগিরই একদিন কুরআনের সত্যতা উপলব্ধি করবে। কিন্তু সেদিনের উপলব্ধি তোমাদের কোনো কাজে আসবে না। কারণ, তখন এই দুনিয়া থেকে তোমরা বিদায় নিয়েছো এবং ভুল সংশোধনের সুযোগ শেষ হয়ে গেছে।
এই তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:
১- যারা দ্বীন প্রচারের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তাদের কোনো ধরনের পার্থিব স্বার্থ হাসিলের আশা করা যাবে না। দাওয়াতের কাজে সফলতা অর্জনের জন্য এটি একটি প্রধান পূর্বশর্ত।
২- কারো কথা, কাজ ও আচরণে অসঙ্গতি থাকলে তার পক্ষে দ্বীনের দাওয়াতের কাজে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব নয়। আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় পৌঁছে দিতে হবে এবং নিজের জীবনে তা বাস্তবায়ন করে উদাহরণ পেশ করতে হবে। তা না হলে মানুষ দাওয়াতের বাণী শোনার পরিবর্তে দ্বীন থেকে দূরে সরে যাবে।
৩- পবিত্র কুরআন হচ্ছে উপদেশ ও সতর্কবাণী যা অনুসরণ করলে মানুষ দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা অর্জন করে। #
পার্সটুডে/এমএমআই/এআর/২০
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।