ডিসকভার ইরান:
তাবরিজ: রেশম পথের ঐতিহ্য থেকে শিল্প-বাণিজ্যের নতুন অর্থনীতির পথে
পার্সটুডে: ইরানের অর্থনৈতিক মানচিত্রে তাবরিজের অবস্থান বরাবরই আলাদা। দেশের উত্তর-পশ্চিমে, তুরস্ক, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের কাছে অবস্থিত এই শহর শত শত বছর ধরে ইরানের অভ্যন্তরীণ বাজার এবং আনাতোলিয়া, ককেশাস, মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের বাণিজ্যপথের মিলনস্থল হিসেবে কাজ করে এসেছে।
একুশ শতকেও এই ভৌগোলিক সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যদিও তাবরিজের অর্থনৈতিক চরিত্র অনেক বদলেছে। এখন আর এটি শুধু প্রথাগত বাণিজ্যকেন্দ্র নয়, তাবরিজ হয়ে উঠেছে বহুমুখী শিল্প ও বাণিজ্যের একটি মহানগর। এর অর্থনীতি ছড়িয়ে আছে উৎপাদন, প্রকৌশল, পেট্রোকেমিক্যাল, খাদ্যশিল্প, বাণিজ্য, পর্যটন এবং ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা জ্ঞানভিত্তিক খাতে।
রেশম পথে লেখা ইতিহাস
তাবরিজের অর্থনৈতিক পরিচয় গড়ে উঠেছে আধুনিক যুগের অনেক আগেই। তাবরিজের ঐতিহাসিক বাজার কমপ্লেক্স এ ধরনের ইটের তৈরি ঢাকা স্থাপনার মধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম এবং একটি বিশাল অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থা। রেশম পথে শহরটির কৌশলগত অবস্থানের কারণেই এর জন্ম।
এই বিশাল বাণিজ্যজাল চীন ও তার ওপার থেকে তাবরিজ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ফলে শহরটি হয়ে ওঠে প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র, যার প্রভাব ককেশাসের ওপার থেকে আরব দেশ, পশ্চিম এশিয়া, আফ্রিকা, ইস্তাম্বুল ও ইউরোপের বহু দেশে পৌঁছেছিল।
পুরোনো শহরে ছিল অনেকগুলো ফটক, যেগুলো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরের সঙ্গে যোগাযোগ করে দিত। এতে বোঝা যায়, নগরের ভেতরে ও বাইরে যোগাযোগ কত বিস্তৃত ছিল।
ইরানে রেশম পথ রেই শহরের পর দুই ভাগ হয়ে যেত। আজারবাইজান অঞ্চলের ভেতর দিয়ে যাওয়া উত্তরের পথটিকে শুরুতে গৌণ মনে করা হতো, কারণ পাহাড়ি ভূখণ্ড ও প্রচণ্ড তুষারপাতে বছরের বড় অংশে চলাচল কঠিন ছিল। কিন্তু ইলখানি শাসনামলে, যখন মারাগেহ ছিল রাজধানী, এই অঞ্চলের নিরাপত্তার কারণে পথটি ইরানীয় মালভূমির প্রধান মহাসড়কে পরিণত হয়।
এই বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি ছিল অবিশ্বাস্যরকম টেকসই। বহু ভয়াবহ ভূমিকম্পের পরও বাজারের মূল কাঠামো অটুট থেকেছে। তাবরিজের কার্পেট, চামড়াজাত পণ্য ও শুকনো ফলের মতো জনপ্রিয় পণ্য আদান-প্রদানের কেন্দ্র হিসেবে বাজারটি টিকে ছিল, আর এসব পণ্যের উৎপাদন ও বিতরণের পুরো চক্র চলত বাজারের ভেতরেই।
উনিশ শতকে কাজার যুগের শুরুতে হারানো গুরুত্ব তাবরিজ ফিরে পায়। বহু দিক থেকে শহরটি হয়ে ওঠে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর। রাজনৈতিক গুরুত্বে ছিল শুধু তেহরানের পরেই, আর ওই শতকের শেষ তিন-চতুর্থাংশ সময় ছিল ইরানের সবচেয়ে জনবহুল শহর।
শহরটির বাণিজ্যের সিংহভাগ হতো তিনটি প্রতিবেশী অঞ্চলের সঙ্গে: ককেশাস, পূর্ব আনাতোলিয়া ও মধ্য ইরান। তাবরিজ ছিল এগুলোর কেন্দ্রস্থলে।
১৮৩০-এর দশকে ব্রিটিশ বাণিজ্য সংস্থাগুলো তাবরিজ-ত্রাবজোন পথ চালু করে। শিগগিরই এই পথে বছরে প্রায় ১০ লাখ পাউন্ডের পণ্য পরিবহন হতে থাকে।
১৮৫০ সাল নাগাদ তাবরিজ হয়ে ওঠে ইরানের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের প্রায় সব দেশে ইউরোপের কৃষিপণ্য ও শিল্পপণ্য এই শহর থেকেই সরবরাহ হতো।
তাবরিজে আমদানি হওয়া পণ্যের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মধ্য ইরানে চলে যেত, আর এক-তৃতীয়াংশ থাকত আজারবাইজান অঞ্চলের ভেতরে।
এই ইতিহাস শহরটির আজকের উচ্চাকাঙ্ক্ষার শক্ত ভিত। গ্র্যান্ড বাজার এখনো ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং তাবরিজের ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক ভূমিকার জীবন্ত সাক্ষী।
পূর্ব ও পশ্চিমের কৌশলগত প্রবেশদ্বার
ভূগোল বরাবরই তাবরিজের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্পদগুলোর একটি। আধুনিক আঞ্চলিক অর্থনীতিতে এই কৌশলগত শহরের ভূমিকা এখনো ভূগোলই নির্ধারণ করে।
ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও শিল্পগত নানা কারণ মিলিয়ে পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশ ইরানের পূর্ব-পশ্চিম সংযোগের অন্যতম কৌশলগত বিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রধান আঞ্চলিক বাজারগুলোর সংযোগস্থলে অবস্থিত এই প্রদেশ ঐতিহাসিকভাবে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে প্রবেশদ্বারের কাজ করেছে, আজও সেই ভূমিকা প্রাসঙ্গিক।
একসময় রেশম পথ এই অঞ্চল দিয়েই গেছে, যা তাবরিজকে বড় বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার ভিত্তি দিয়েছিল। এই দীর্ঘ বাণিজ্য-ঐতিহ্যের ফলেই গড়ে ওঠে শহরের ঐতিহাসিক বাজার, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ঢাকা বাজার, এবং প্রতিষ্ঠিত হয় ইরানের প্রথম চেম্বার অব কমার্স।
ইরান, তুরস্ক ও ককেশাসের মাঝে প্রবেশদ্বার হওয়ায় তাবরিজের সামনে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর অবস্থান শহরটিকে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবেশী বাজারের দিকে এবং সেগুলোর মাধ্যমে পশ্চিম ও উত্তরের বিস্তৃত বাজারের দিকে ঝুঁকিয়ে রেখেছে।
সড়ক, রেল, বিমান যোগাযোগ ও শুল্ক সুবিধার একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তাবরিজকে ইরান ও আশপাশের অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করে এই সুবিধাকে আরও জোরদার করেছে।
আরাস মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল এই কৌশলগত অবস্থানের সবচেয়ে স্পষ্ট আধুনিক উদাহরণগুলোর একটি।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে সীমান্তবর্তী গভর্নরদের কিছু ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে, যার সুবিধা পাচ্ছে এই অঞ্চল। এর জুলফা ও নরদুজ সীমান্ত টার্মিনাল সীমান্তপারের বাণিজ্যের সক্রিয় প্রবেশপথ। বাণিজ্য বাড়তে থাকায় এগুলোর অবকাঠামো ও কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নে নজর বেড়েছে।
আরাস মুক্ত অঞ্চল বহুমুখী উন্নয়ন কৌশলও নিয়েছে। বিনিয়োগ হচ্ছে শিল্প, পর্যটন, গ্রিনহাউস কৃষি ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে। সাম্প্রতিক মূল্যায়নে অঞ্চলটি নির্মাণ কার্যক্রমে ভালো অবস্থানে আছে এবং পর্যটনে বিশেষভাবে ভালো করেছে, যা এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিস্তৃতি দেখায়।
পর্যটনের জন্যও তাবরিজের আঞ্চলিক যোগাযোগ সমান গুরুত্বপূর্ণ। শহরটি একা বিচ্ছিন্ন গন্তব্য হিসেবে নয়, বরং উত্তর-পশ্চিম ইরানের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করতে পারে। পর্যটকেরা তাবরিজে থেকে জুলফা, কান্দোভান, উর্মিয়া হ্রদ এবং অঞ্চলটির বহু ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক আকর্ষণ ঘুরে দেখতে পারেন।
বর্তমান অর্থনীতিতে এই ভৌগোলিক অবস্থান তাবরিজকে তার পুরোনো অর্থনৈতিক সুবিধাগুলোর একটিকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার সুযোগ দিচ্ছে। আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো ও শিল্পসক্ষমতার সঙ্গে অবস্থানকে যুক্ত করে শহরটি ইরানের উৎপাদন, প্রকৌশল, বাণিজ্য ও সেবা খাতকে তুরস্ক, ককেশাস, মধ্য এশিয়া ও আরও দূরের বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে।
সড়ক, রেল ও আকাশপথে বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ
পরিবহন অবকাঠামো তাবরিজের অর্থনৈতিক সংযোগের মেরুদণ্ড। পূর্ব আজারবাইজানকে ইরানের অন্যান্য অংশ ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যুক্ত করা যোগাযোগ করিডোর সম্পন্ন ও উন্নত করতে বড় প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।
পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের কৌশলগত ভূগোলের কারণে সড়ক, রেল ও বিমান করিডোরের উন্নয়ন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাই সরকারি পরিকল্পনা ও তদারকির একটি বড় অংশ গেছে বড় পরিবহন প্রকল্প সম্পন্ন করা এবং আঞ্চলিক ট্রানজিট নেটওয়ার্কে প্রদেশটির অবস্থান শক্তিশালী করার দিকে।
বেশ কয়েকটি বড় সড়ক প্রকল্প হয় চালু হয়েছে, শেষের পথে, নয়তো সক্রিয়ভাবে এগোচ্ছে। তাবরিজ-জানজান ফ্রিওয়ের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নতুন করে পিচ দেওয়ার কাজ হয়েছে, এবং উন্নত পথটি এখন চালু আছে।
তাবরিজ-বাজারগান ফ্রিওয়ে প্রদেশের পরিবহন নেটওয়ার্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ। তাবরিজ-সুফিয়ান অংশ ইতিমধ্যে চালু, আর নয় কিলোমিটারের সুফিয়ান-শুর দারক অংশ শেষ হওয়ার পথে। তুরস্কের সঙ্গে ইরানের অন্যতম প্রধান স্থলপথ প্রবেশদ্বার বাজারগানের দিকে পথটি বাড়ানো নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনাও চলছে।
তাবরিজ-উর্মিয়া ফ্রিওয়ে ছয়টি অংশে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার দুটি এখন সক্রিয়। অন্যদিকে হাশত্রুদ-মারাগেহ ফ্রিওয়ের নয় কিলোমিটার চালুর জন্য প্রস্তুত, এবং করিডোরটি তামারচিন সীমান্ত পারাপার পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনাও এগোচ্ছে।
অন্য প্রকল্পগুলো আঞ্চলিক চলাচল উন্নত করার দিকে মনোযোগী। ইলখচি বাইপাস খুলে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত, আর পূর্ব বোনাব বাইপাস ও আজবশির বাইপাসকে পরবর্তী তদারকি ও উন্নয়নের অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
রেল সংযোগও পূর্ব আজারবাইজানের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভূমিকার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। খাভারান স্টেশনকে তাবরিজ সেন্ট্রাল স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত করা, এরপর সোরাইয়া ঝরনার দিকে বাড়ানোর পরিকল্পনা শুধু একটি প্রাদেশিক অবকাঠামো প্রকল্প নয়।
এটি বৃহত্তর পূর্ব-পশ্চিম রেল করিডোরের অংশ, যা সারাখস-সোরাইয়া পথের সঙ্গে যুক্ত এবং শেষ পর্যন্ত চীন ও ইউরোপের মধ্যে রেল সংযোগের সম্ভাবনা শক্তিশালী করবে।
এ অর্থে করিডোরটি রেশম পথে তাবরিজের ঐতিহাসিক ভূমিকারই প্রতিধ্বনি। আধুনিক রেল অবকাঠামো সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সেবা করলেও মূল নীতি একই: দক্ষ স্থলপথ পরিবহনের মাধ্যমে বিশাল ভৌগোলিক এলাকাজুড়ে উৎপাদনকেন্দ্র ও বাজারকে যুক্ত করা।
কালালেহ-জুলফা সড়ক প্রকল্প আরেকটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর প্রশস্তকরণ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে মনোযোগ পেয়েছে, যা উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে প্রবেশাধিকার উন্নত করার গুরুত্ব দেখায়। বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে এই করিডোর শক্তিশালী হলে জাঙ্গেজুর করিডোরকে ঘিরে ঘটনাপ্রবাহের কারণে সৃষ্ট পরিবহন ও সংযোগ-সংকটের কিছুটা প্রশমনও হতে পারে।
আকাশপথের যোগাযোগও নতুন করে নজর পাচ্ছে। বছরের পর বছর পরে তাবরিজ বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক ট্রানজিট হল সম্পন্ন করার বিষয়টি সড়ক ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচিতে এসেছে। এতে ব্যবসা ও পর্যটন উভয় ধরনের যাত্রী সামলানোর সক্ষমতা বাড়তে পারে।
কঠিন পরিস্থিতিতে প্রদেশের পরিবহন অবকাঠামোর সহনশীলতাও প্রমাণিত হয়েছে। সাম্প্রতিক চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সময় তাবরিজ বিমানবন্দর এগারোটি জায়গায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু নয় দিনের মধ্যে আবার চালু হয়। মধ্য ইরানের সঙ্গে প্রদেশকে যুক্ত করা রেললাইনের ক্ষতিগ্রস্ত দুটি অংশ ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পুনর্নির্মাণ করা হয়, ফলে অপেক্ষাকৃত দ্রুত রেল সংযোগ ফিরে আসে।
একই সময়ে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হাশত্রুদ সেতুর ক্ষেত্রে বড় পুনর্নির্মাণ চলাকালে সাধারণ যান চলাচলের জন্য অস্থায়ী বাইপাস তৈরি করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে এসব প্রকল্প দেখায়, পূর্ব আজারবাইজানের পরিবহন অবকাঠামো শুধু প্রাদেশিক উন্নয়নের বিষয় নয়। প্রদেশের অনেক প্রধান করিডোরের জাতীয়, আন্তঃদেশীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব আছে। এগুলোর কৌশলগত পরিধি এত বড় যে শুধু প্রাদেশিক সম্পদের ওপর নির্ভর করলে সময়মতো শেষ করা কঠিন হবে। তাই টেকসই জাতীয় বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংযোগ উদ্যোগ জরুরি।
বহুমুখী শিল্প শক্তিকেন্দ্র
তাবরিজকে ঘিরে থাকা শিল্প-অর্থনীতি অস্বাভাবিক রকম বিস্তৃত। এই বৈচিত্র্যের কারণে শহরটি কোনো একটি অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপর কম নির্ভরশীল।
যন্ত্রনির্মাণ ও ট্রাক্টর উৎপাদনের মতো প্রধান শিল্প তাবরিজেই অবস্থিত। যন্ত্রনির্মাণ শিল্প, যাকে বলা হয় "কারখানা বানানোর কারখানা", প্রদেশের শিল্পোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
যানবাহনের যন্ত্রাংশ ও যন্ত্রপাতি উৎপাদনেও প্রদেশের উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা আছে। এই সক্ষমতা গড়ে উঠেছে অঞ্চলটির কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ইতিহাসের পাশাপাশি।
ইরান ট্রাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি ও তার সহযোগী শিল্পগোষ্ঠী এখনো শহরের সবচেয়ে পরিচিত উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম।
গোষ্ঠীটি বার্ষিক ট্রাক্টর উৎপাদন প্রায় ২১ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৪০ হাজারে নিয়েছে এবং ২৫টিরও বেশি দেশে ট্রাক্টর রপ্তানি করছে। জানা যায়, রপ্তানির মূল্য প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ ডলার, আর উন্নয়ন প্রকল্প ও যন্ত্রপাতি আধুনিকীকরণে প্রায় ৯ ট্রিলিয়ন তোমান বিনিয়োগ হয়েছে।
শহরের যন্ত্রশিল্পের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের পুরোনো মেশিন সাজি তাবরিজ কমপ্লেক্সের সঙ্গেও যুক্ত। এর আধুনিকীকরণ ও পুনরুজ্জীবন আবার নীতিগত অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে, এবং ইরানের শিল্প উন্নয়ন ও নবায়ন সংস্থার অংশগ্রহণে আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন পর্যায়ে ঢুকেছে।
জ্বালানি-সংক্রান্ত শিল্প আধুনিক অর্থনীতির আরেকটি প্রধান অংশ। তাবরিজে আছে একটি বড় তেল শোধনাগার এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সগুলোর একটি। এতে হাইড্রোকার্বন প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে মহানগরের অর্থনীতির ভূমিকা তৈরি হয়েছে।
ইরানের শিল্পখাতের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাবরিজ তেল শোধন কোম্পানি বছরে ২৩৪ ট্রিলিয়ন রিয়াল পরিচালন আয় এবং প্রায় ২৫ ট্রিলিয়ন রিয়াল নিট মুনাফার কথা জানিয়েছে।
উত্তর-পশ্চিম ইরানের বৃহত্তম পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স হিসেবে বর্ণিত তাবরিজ পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানির বার্ষিক নামমাত্র উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৮ লাখ ৭০ হাজার টন রাসায়নিক ও পলিমার পণ্য, আর বিক্রয়যোগ্য পণ্য প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার টন। এর মধ্যে আছে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পলিস্টাইরিন ও এবিএস পণ্য।
৩১ ট্রিলিয়ন রিয়ালের বেশি মূল্যের পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ২০টি দেশে রপ্তানি হয়েছে। উৎপাদনে স্থিতিশীলতা আনা, যন্ত্রপাতি উন্নত করা এবং রপ্তানি আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি নিতে ৩ লাখ ৭০ হাজার জনঘণ্টারও বেশি শ্রমের একটি বড় ওভারহল সম্পন্ন করা হয়েছে।
খাদ্যশিল্পও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পূর্ব আজারবাইজানে প্রায় ৪০০টি সক্রিয় খাদ্যশিল্প ইউনিট আছে, যাদের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৬৫ লাখ টন।
মিষ্টি ও চকলেট উৎপাদনে প্রদেশটি দেশে প্রথম। দেশের প্রায় ৫৫ শতাংশ মিষ্টি ও চকলেট এখান থেকে আসে, যেগুলো মান ও ব্র্যান্ডের জন্য পরিচিত।
চামড়া, ব্যাগ ও জুতা শিল্প পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের নির্ধারিত দশটি মূল্য-শৃঙ্খলের একটি। ইরানের জুতা ক্লাস্টারে প্রায় ৩ হাজার উৎপাদন ইউনিট আছে, এর মধ্যে পাঁচশোর বেশি দেশীয় ইউনিট। প্রদেশে প্রায় তিন কোটি জোড়া জুতা উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ১৭.৫ শতাংশ মেটানো হয়, আর স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের কমনওয়েলথ (সিআইএস) ও আঞ্চলিক দেশগুলোতে রপ্তানির সক্ষমতাও আছে।
বেসরকারি উদ্যোগ, বিনিয়োগ ও জ্ঞানভিত্তিক প্রবৃদ্ধি
ইরানের কর্মকর্তা ও অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা প্রায়ই যে বৈশিষ্ট্যটি তুলে ধরেন, তা হলো পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশ ও তাবরিজের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অস্বাভাবিক বড় ভূমিকা।
প্রদেশের অর্থনীতির ৯৪ শতাংশেরও বেশি বেসরকারি খাতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পূর্ব আজারবাইজানে ৫৮টি শিল্পনগরী সক্রিয়, যার ১০টি বেসরকারি খাতের।
এই পরিসংখ্যান দেখায়, প্রদেশে বেসরকারি খাতের শেকড় বহু পুরোনো এবং উৎপাদন ও অর্থনীতিতে তারা এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রদেশটি দেশের শীর্ষ চারটির মধ্যে এবং উৎপাদন লাইসেন্স ইস্যুতে প্রথম। উৎপাদন ত্বরান্বিত করে এমন প্রায় সব সূচকেই এটি শীর্ষ সারিতে।
প্রদেশের তুলনামূলক সুবিধার ভিত্তিতে এর উন্নয়নের জন্য দশটি মূল্য-শৃঙ্খল নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো সরকারের সহায়তার অগ্রাধিকারে আছে এবং প্রদেশের কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ এসব খাতে।
২০২২ সালে প্রদেশে ৪৭ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, যা অনুমোদিত লক্ষ্যমাত্রার ১০৬ শতাংশেরও বেশি। বেকারত্বের হার ১.১ শতাংশ কমেছে।
২০২৩ সালে বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে দুই শ ট্রিলিয়ন তোমানের বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্টের সফরের সময় গভর্নর ও বেসরকারি খাতের মধ্যে ২৩০ ট্রিলিয়ন তোমানেরও বেশি বিনিয়োগের সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
খনিজ মজুতে প্রদেশটি দেশে প্রথম। সুঙ্গুন কপার প্রকল্পের তামা মূল্য-শৃঙ্খলে বিনিয়োগের জন্য গত বছর ৮০ ট্রিলিয়ন তোমান এবং এ বছর ১১০ ট্রিলিয়ন তোমান অনুমোদিত হয়েছে।
তিন শ নিষ্ক্রিয় খনি অধিগ্রহণ করে নিলামের মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিদের দেওয়া হয়েছে, যাতে সেগুলো সক্রিয় হয়। দুই বছরে প্রদেশে গ্রিনহাউসের আয়তন ৩০ শতাংশ বেড়ে ৩৭০ হেক্টরের বেশি হয়েছে।
তাবরিজে বড় বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানও আছে, যা প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও প্রশিক্ষিত পেশাজীবীদের একটি বড় ভাণ্ডার তৈরি করেছে।
তাবরিজ বিশ্ববিদ্যালয়, তাবরিজ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদ মাদানি আজারবাইজান বিশ্ববিদ্যালয় ও তাবরিজ চিকিৎসা বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে ভালো অবস্থানে আছে। শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযোগ জোরদার এবং জ্ঞানভিত্তিক শিল্পকে সহায়তা করার চেষ্টাও চলছে।
বেসাত শিল্পনগরীতে একটি নতুন প্রযুক্তি নগরী গড়ে তোলা হবে। ১০ হাজার ৮০০ হেক্টর আয়তনের এই শিল্পনগরী দেশের সবচেয়ে বড়। এখানে রেল, সড়ক ও বিমানবন্দরের সক্ষমতা আছে, যা শিল্প, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তিকে আগের চেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার ভিত্তি দিতে পারে।
বাণিজ্য, পর্যটন ও সামনের পথ
তাবরিজের স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক বাণিজ্য, এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের পরিধি বেশ বড়।
২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে প্রদেশের শুল্ক সুবিধার মাধ্যমে প্রায় ১০০টি দেশে আনুমানিক ২৫ লাখ ৮৪ হাজার টন পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যার মূল্য ১৩৫ কোটি ১০ লাখ ডলার।
শুধু তাবরিজ শুল্ক অফিসের মাধ্যমেই রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭৮ কোটি ডলারের পণ্য, যা ৯ লাখ ৮৪ হাজার টনের সমান।
তাবরিজ, সাহলান, জুলফা, নরদুজ, মারাগেহ ও বোনাবের শুল্ক সুবিধাগুলো মিলিয়ে পূর্ব আজারবাইজানকে বিশাল আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করেছে। রপ্তানির ধরনও প্রথাগত পণ্যের বাইরে ছড়িয়েছে, এখন এতে আছে যন্ত্রপাতি, তামাক, কোকো, মাংস এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্য।
তাবরিজ চেম্বার অব কমার্স তেল-বহির্ভূত রপ্তানি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শিল্পোন্নয়ন নিয়ে জাতীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করে চলেছে। ২০২৫ সালে শহরটি তেল-বহির্ভূত রপ্তানি উন্নয়নবিষয়ক ২৯তম জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করেছে।
পর্যটন আরেকটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র। ২০২৫ সালের নওরোজের সময় পূর্ব আজারবাইজানে ভ্রমণ, আবাসন ও সীমান্ত পারাপারের মাত্রা ছিল উঁচু, আর তাবরিজ ছিল প্রধান গন্তব্যগুলোর একটি।
২৩ ইসফান্দ থেকে ১৭ ফারভারদিন (১৩ মার্চ থেকে ৬ এপ্রিল, ২০২৫) পর্যন্ত তাবরিজ বিমানবন্দর ৯৭১টি রাউন্ড-ট্রিপ ফ্লাইট সামলেছে, এর মধ্যে ২৮২টি আন্তর্জাতিক। জানা যায়, আগের বছরের নওরোজ সময়ের তুলনায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ১৮ শতাংশ বেশি ছিল।
শহরের পর্যটন আকর্ষণ আরাস অঞ্চলের বাইরেও ছড়িয়ে আছে, যার মধ্যে প্রাকৃতিক, ঐতিহাসিক, ঐতিহ্যগত, স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যটন রয়েছে। প্রায় ৭৫০ বছরের বৈজ্ঞানিক ইতিহাসের অধিকারী রাবে রাশিদি প্রদেশের বিজ্ঞান-পর্যটন সম্ভাবনার একটি উদাহরণ।
কার্পেট খাত প্রথাগত শিল্পগুলোর সামনে থাকা সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ, দুটোই তুলে ধরে।
তাবরিজ বহু প্রজন্ম ধরে ইরানের কার্পেট নকশা, উৎপাদন ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নয়টি ভৌগোলিক নিদর্শন জাতীয় পর্যায়ে নিবন্ধিত হয়েছে, যার মধ্যে আছে সারদরুদ কার্পেট ট্যাবলো এবং বখশায়েশ, খাজে, মেহেরবান, সারাব, শাবেস্তার ও আজারশাহরের হাতে বোনা কার্পেট।
ইরানের অর্থনৈতিক রাজধানী হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তাবরিজ চার হাজার বিলিয়ন তোমান বিনিয়োগ আকর্ষণের একটি সুসংহত পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এই পুঁজি আসবে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ, বিদেশি পুঁজি আকর্ষণ ও নগর-সম্পদ সৃষ্টির মাধ্যমে। তাই তাবরিজের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ অতীতে ফেরা নয়, বরং অতীতেরই সম্প্রসারণ। যে শহর একদিন ব্যবসায়ী ও পণ্যকে এক জায়গায় এনে সমৃদ্ধ হয়েছিল, সেই শহরই এখন কারখানা, প্রযুক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়, রপ্তানিকারক, উদ্যোক্তা ও বিশ্ববাজারকে যুক্ত করে সমৃদ্ধি গড়তে পারে।#
পার্সটুডে/এমএআর/১৭