তিক্ততা কাটাতে ইরান-ব্রিটেন রাষ্ট্রদূত পর্যায়ের সম্পর্ক: তেহরানের প্রতিক্রিয়া
ইরান ও ব্রিটেনের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে দু'দেশই রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে রাষ্ট্রদূত পর্যায়ের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছে।
সোমবার বিকেলে হামিদ বাইদিনেজাদ লন্ডনে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইরানের নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিজের পরিচয়পত্র তুলে ধরেছেন। ঠিক একই সময়ে তেহরানে নিযুক্ত নয়া ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত নিকোলাস হপটন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজের পরিচয়পত্র পেশ করেন। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর রাষ্ট্রদূত বিনিময়ের ঘটনা দু'দেশের মধ্যকার উত্তেজনা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে কিনা সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাহরাম কাসেমি গতকাল সংবাদ সম্মেলনে লন্ডনের সঙ্গে তেহরানের কূটনৈতিক সম্পর্কের ব্যাপারে বলেছেন, রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার অর্থ এ নয় যে, দুপক্ষের মধ্যে বিরাজমান মতপার্থক্যের অবসান ঘটেছে।
২০১১ সালের নভেম্বরে ইরানের ওপর ব্রিটেনের নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়ানোর পর শত শত ইরানি ছাত্র তেহরানে ব্রিটিশ দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ করে। তারা দূতাবাসের ব্রিটিশ পতাকা নামিয়ে ফেলে এবং ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারের দাবি জানায়। এর পরদিনই তেহরান থেকে নিজের কূটনীতিক ও দূতাবাস কর্মীদের প্রত্যাহার করে নেয় ব্রিটেন। তবে প্রায় এক বছর আগে দুদেশ চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্স পর্যায়ে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। কয়েক মাস আগেই লন্ডন কর্তৃপক্ষ ইরানের সঙ্গে রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছিল। এরপর ইরান ও ব্রিটেনের কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর তেহরান রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সম্মত হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান ও ব্রিটেনের সম্পর্কের উত্থান-পতনের বহু ইতিহাস রয়েছে। ব্রিটেন যখন উনবিংশ শতাব্দীতে ইরানের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এ অঞ্চলে প্রবেশ করে তখন থেকেই বিভিন্ন ইস্যুতে এ দু'দেশের মধ্যে মতবিরোধ শুরু হয়। অতীত থেকেই ব্রিটেন কেবল নিজের স্বার্থে ইরানকে কখনই গঠনমূলক দৃষ্টিতে দেখে নি এবং ইরানের জন্য বহু তিক্ত ঘটনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ইরানে তেল জাতীয়করণের বিরোধিতা করেছিল ব্রিটেন। এছাড়া, ১৯৫৩ সালে বৈধ মোসাদ্দেক সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থানেও ব্রিটেনের হাত ছিল। এরপর ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে ব্রিটেনের হস্তক্ষেপ বেড়ে যাওয়ায় ইরানের জনমনে ব্রিটিশ-বিরোধী মনোভাব তুঙ্গে ওঠে। ব্রিটেন তার প্রাচীন ঔপনিবেশিক আচরণ অর্থাৎ 'ভাগ কর শাসন কর' নীতির ভিত্তিতে বহুবার ইরানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালিয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্যই ছিল ইরানের তেল শিল্পের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
সাম্রাজ্যবাদী নীতির অনুসারী ব্রিটেনের ব্যাপারে আশাবাদী হওয়ার সম্ভাবনা খুব কমই। কিন্তু তারপরও দুদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নিয়েছে। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পরপরই ইরাকের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে সাদ্দামকে পূর্ণ সমর্থন দেয় ব্রিটেন। ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী কুখ্যাত লেখক সালমান রুশদিকে ব্রিটেনই সমর্থন যোগায়। এছাড়া, ইরানে দশম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর নৈরাজ্য সৃষ্টিতে ব্রিটিশ দূতাবাসের ন্যক্কারজনক ভূমিকা ঘটনা দুদেশের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তাই এসব ক্ষত হয়ত একেবারে সারিয়ে তোলা সম্ভব নয়।
যাহোক, বর্তমানে ব্রিটেনের প্রতিটি আচরণ ও কর্মকাণ্ডের ওপর ইরান নজর রাখছে। ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর বিভিন্ন সময়ে ব্রিটেনের বিদ্বেষী আচরণ এবং সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার মতো ঘটনাগুলো থেকে বোঝা যায় দুদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।#
পার্সটুডে/মোঃ রেজওয়ান হোসেন/৬