বিশ্লেষণ | ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অর্থনৈতিক যুদ্ধ কি লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে?
-
• স্কট বেসেন্ট, মার্কিন অর্থমন্ত্রী
পার্সটুডে: ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর যুদ্ধ যখন অচলাবস্থায় পৌঁছেছে এবং সামরিক অভিযান নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, তখন ওয়াশিংটন তার কৌশল পরিবর্তন করে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু সামরিক ক্ষেত্র থেকে অর্থনৈতিক অঙ্গনে স্থানান্তর করেছে।
পার্সটুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যর্থতার পর মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ (Operation Economic Outcast) ঘোষণা করেন। তিনি এমন একটি অভিযান শুরুর কথা জানান, যার লক্ষ্য ইরানকে ‘অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরোধ করা’ এবং দেশটির সব গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া।
বেসেন্ট এই পদক্ষেপকে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ‘বড় আক্রমণের দিন’ এবং কোনো শত্রুর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত পরিকল্পিত সবচেয়ে বড় আর্থিক হামলা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, যে কোনো দেশ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখলে ‘ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়ায় অংশীদার হবে’ এবং ‘কেউই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে নয়।’ তিনি চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে সতর্ক করে বলেন, ইরানের তেল লেনদেনে সহায়তাকারী যেকোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। ওয়াশিংটনের শাস্তি থেকে কেউই রেহাই পাবে না।
নতুন নিষেধাজ্ঞাগুলো পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাত- ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, সোনা, বিমান চলাচল এবং সামুদ্রিক পরিবহন- কে লক্ষ্যবস্তু করেছে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ৬০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও জাহাজ নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে। ট্রাম্প প্রশাসন আরও ঘোষণা করেছে, ইরানের পক্ষে অর্থপাচারে যেকোনো ধরনের সহায়তা করলে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বহিষ্কারের মুখে পড়তে হবে।
তবে ওয়াশিংটনের নতুন কৌশলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে মার্কিন জনমতের ব্যাপক সমর্থন হ্রাস। সোমবার প্রকাশিত রয়টার্স/ইপসোসের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করেন। মার্চে এই হার ছিল ৩৭ শতাংশ এবং চলতি মাসের শুরুতে ছিল ৩৪ শতাংশ।
এই পতনের প্রধান কারণ রিপাবলিকানদের মধ্যে যুদ্ধের সমর্থন কমে যাওয়া। রিপাবলিকানদের মধ্যে যুদ্ধের সমর্থন মার্চের ৭৭ শতাংশ থেকে কমে ৬৯ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও তাঁর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে; মাত্র ৩৩ শতাংশ উত্তরদাতা তাঁর কর্মক্ষমতাকে অনুমোদন করেছেন। এছাড়া ৮৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, এই যুদ্ধ ‘দীর্ঘ সময় ধরে’ চলবে। এসব পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, যুদ্ধের সামাজিক ভিত্তি শুধু দুর্বলই হচ্ছে না, বরং অভ্যন্তরীণভাবে নিজেদের নীতির বৈধতা নিয়েও হোয়াইট হাউস সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।
অন্যদিকে, প্রায় পাঁচ দশক ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মোকাবিলার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ইরান নিজেদের শক্তি ও দুর্বলতার গভীর উপলব্ধির ভিত্তিতে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি এক বিবৃতিতে অর্থনীতিকে শত্রুর বিরুদ্ধে ‘প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলায় অর্থনীতি, বাণিজ্য, তেল, শিল্প, কৃষি, ব্যাংকিং ও কূটনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা ও সহকারী মোহাম্মদ মোখবের ঘোষণা করেছেন, অর্থনৈতিক চাপসহ যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের শত্রুতামূলক পদক্ষেপ মোকাবিলায় ইরান ‘প্রতিরোধ পরিকল্পনা’ প্রস্তুত করেছে।
অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও সামুদ্রিক অবরোধের বিরুদ্ধে ইরানের অন্যতম প্রধান শক্তি হলো হরমুজ প্রণালিতে দেশটির অনন্য ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান। এই কৌশলগত জলপথে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরান কার্যত তার প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেছে। ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা, যার মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়িও রয়েছেন, স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন যে অর্থনৈতিক যুদ্ধ আরও তীব্র হলে হরমুজ প্রণালি, এমনকি পারস্য উপসাগর থেকেও কোনো তেল রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না। এমন পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নজিরবিহীন ধাক্কা সৃষ্টি করতে পারে।
এছাড়া ইরান ‘ছায়া নৌবহর’, স্থলপথ এবং বিকল্প পরিবহন রুট ব্যবহার করে যতটা সম্ভব তেল রপ্তানি ও প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে।
আঞ্চলিক পর্যায়েও ইরান ‘আঞ্চলিক কার্ড’ ব্যবহার করছে। ইরাকি জাহাজকে বিশেষ অনুমতি দেওয়া এবং নৌপথ নিয়ে ওমানের সঙ্গে সমঝোতা—এগুলোকে তেহরানের এমন প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরি করা এবং তাদের আরও বাস্তবসম্মত অবস্থান গ্রহণে উৎসাহিত করা যায়।
যদিও যুদ্ধ ও সামুদ্রিক অবরোধ ইরানের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে, বিশেষজ্ঞদের মতে, নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ইরানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের সক্ষমতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ অবশ্যই ইরানের অর্থনৈতিক পতন বা তেহরানের নীতিগত পরিবর্তন ঘটাবে- এমন নিশ্চয়তা নেই।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে ওয়াশিংটনের আগ্রাসী অর্থনৈতিক কৌশল এবং দেশের ভেতরে সেই নীতির প্রতি কমে যাওয়া সমর্থনের স্পষ্ট বৈপরীত্য।
ট্রাম্প প্রশাসন যখন ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অর্থনৈতিক আক্রমণের অভিযান শুরু করেছে, তখনই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধে অচলাবস্থায় পড়েছে এবং একই সঙ্গে মার্কিন জনমতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সমর্থনও হারিয়েছে।
অন্যদিকে, নজিরবিহীন চাপের মধ্যেও ইরানের হাতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি, দীর্ঘদিনের ‘প্রতিরোধী অর্থনীতি’র অভিজ্ঞতা এবং প্রতিপক্ষের জন্য বড় ধরনের ব্যয় তৈরি করার সক্ষমতার মতো কৌশলগত হাতিয়ার।
আগামী কয়েক সপ্তাহ ও মাসে যে পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা শুধু কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার মোকাবিলা করে আসা ইরানের অর্থনীতির জন্যই পরীক্ষা নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ’ কৌশল কতটা কার্যকর, তারও পরীক্ষা হবে। আর এই পরীক্ষা এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভিত্তি উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।#
পার্সটুডে/এমআরএইচ/২৫
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন