ইউরোপ কীভাবে তার কৌশলগত স্বাধীনতা থেকে দূরে সরে গেল?
https://parstoday.ir/bn/news/world-i162708-ইউরোপ_কীভাবে_তার_কৌশলগত_স্বাধীনতা_থেকে_দূরে_সরে_গেল
পার্সটুডে-ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমায়িল বাকায়ি বলেছেন, “ইউরোপকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে-সে কি স্বাধীনভাবে ভূমিকা পালন করবে, নাকি অন্যের নীতি  অনুসরণে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে যাবে যে সেই অনুসরণকে স্বাধীনতা বলে ভুল করবে।”
(last modified 2026-09-02T14:14:58+00:00 )
সেপ্টেম্বর ০২, ২০২৬ ১৬:০৭ Asia/Dhaka
  • ইউরোপীয় ইউনিয়ন
    ইউরোপীয় ইউনিয়ন

পার্সটুডে-ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমায়িল বাকায়ি বলেছেন, “ইউরোপকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে-সে কি স্বাধীনভাবে ভূমিকা পালন করবে, নাকি অন্যের নীতি  অনুসরণে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে যাবে যে সেই অনুসরণকে স্বাধীনতা বলে ভুল করবে।”

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত অর্থনৈতিক চাপকে সমর্থন করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্প্রতি যে অবস্থান নিয়েছে, বাকায়ির এই বক্তব্য তারই যথার্থ প্রতিফলন। বিষয়টির শুরুতেই রয়েছে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এমন নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করছে, যার আইনি ভিত্তি ইউরোপের নিজস্ব বিধিবিধান ও সরকারি অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বাকায়ি স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজস্ব বিধি অনুযায়ী তৃতীয় কোনো দেশের আরোপিত আইনের বহির্দেশীয় প্রয়োগকে স্বীকৃতি দেয় না এবং এ ধরনের আইনের কার্যকারিতা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে মনে করে। তাহলে প্রশ্ন হলো-ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন ইরানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে অন্যায় ও অবৈধ নিষেধাজ্ঞাগুলোকে কীভাবে সমর্থন করছে?

এর উত্তর খুঁজতে হবে ইউরোপের অবস্থানের পরিবর্তনের মধ্যে।

১৯৯৬ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্রের বহির্দেশীয় নিষেধাজ্ঞা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলেছিল, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘ব্লকিং রেগুলেশন’ বা নিষেধাজ্ঞা প্রতিরোধী আইন প্রণয়ন করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল অন্য দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইন চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। তখন ইউরোপ শুধু বিবৃতিতে নয়, বাস্তব প্রতিরোধের মাধ্যমেই ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে নিজের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেছিল।

কিন্তু আজ একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার নীতি ইরানের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হলেও ইউরোপ শুধু তার নিজস্ব নীতি থেকে সরে যায়নি; বরং যে নিষেধাজ্ঞাকারীর বিরুদ্ধে একসময় অবস্থান নিয়েছিল, আজ তার পাশেই দাঁড়িয়েছে।

বাকায়ির ভাষায়, ১৯৯৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন স্বাধীনভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ‘ব্লকিং রেগুলেশন’ গ্রহণ করেছিল। অথচ আজ সেই একই ইউনিয়ন ওয়াশিংটনের আইনভঙ্গের পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়েছে।

এই পরিবর্তন ইউরোপের কথিত ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বা Strategic Autonomy'র বিশ্বাসযোগ্যতাকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।

কৌশলগত স্বাধীনতার অর্থ তখনই হয়, যখন কোনো শক্তি তার চেয়ে বড় কোনো শক্তির সঙ্গে মতবিরোধের ক্ষেত্রে নিজের মূল্যায়ন ও স্বার্থের ভিত্তিতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ইউরোপ যদি কেবল তখনই স্বাধীনতার কথা বলে, যখন তার অবস্থান ওয়াশিংটনের অবস্থানের সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ একটি আনুষ্ঠানিক ও অর্থহীন ধারণায় পরিণত হয়।

এ কারণেই বাকায়ি বলেছেন, ইউরোপ আর ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের’ কথা বলতে পারে না, যখন বাস্তবে সে নিজেকে ওয়াশিংটনের নির্দেশ বাস্তবায়নকারীতে পরিণত করেছে। তাঁর মতে, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বড় বড় ঘোষণার মাধ্যমে অর্জিত হয় না; বরং স্বাধীন ও দায়িত্বশীলভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইচ্ছা ও সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমেই তা প্রতিষ্ঠিত হয়-এমনকি সেই সিদ্ধান্ত কোনো বৃহৎ শক্তির অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলেও।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের প্রতি ইউরোপের সমর্থন ছিল এই দাবিরই একটি বাস্তব পরীক্ষা। আর এই পরীক্ষার ফল দেখিয়েছে, ইউরোপের সমস্যা সক্ষমতার অভাব নয়; বরং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বাধীন অবস্থান নেওয়ার মতো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আইনি সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ক্ষেত্রে ইউরোপ ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলার পথই বেছে নিয়েছে-যদিও তা ইউরোপের নিজস্ব আইনি নীতি ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

এখানেই ইউরোপের বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপকে সমর্থন করছে, অন্যদিকে নিজেকে উত্তেজনা কমানো ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পক্ষের শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে। অথচ দুটি অবস্থান একসঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অর্থনৈতিক চাপের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সংকট নিয়ন্ত্রণের দাবি করা যায় না। বাকায়ি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ওয়াশিংটনের ইরান বিরোধী ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’কে সমর্থন করতে পারে না এবং একইসঙ্গে উত্তেজনা কমানো ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করার দাবি করতে পারে না।

এই বৈপরীত্যের প্রভাব ইউরোপের ওপরও ফিরে এসেছে। আঞ্চলিক সংকট, সমুদ্রপথে নিরাপত্তাহীনতা এবং জ্বালানি বাজারের ওপর চাপ ইউরোপীয় অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করছে। ইউরোপ নিজেই অস্থিতিশীলতার অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত মূল্য দিচ্ছে; অথচ একই সময়ে এমন একটি নীতিকে সমর্থন করছে, যা উত্তেজনা কমানোর পরিবর্তে সংঘাত আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এ কারণেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে একাত্ম হয়ে চলা ইউরোপের জন্য একটি কৌশলগত ভুল হয়ে উঠছে।

এই প্রেক্ষাপটে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে ইউরোপের সমর্থন নিছক একটি রাজনৈতিক অবস্থান নয়, যার কোনো মূল্য দিতে হবে না। বাকায়ির দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থন আন্তর্জাতিক আইনেরও গুরুতর ও স্পষ্ট লঙ্ঘন।

এ ধরনের নীতির সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত থাকার পর তার পরিণতি থেকে নিজেদের আলাদা রাখার সুযোগ ইউরোপীয় দেশগুলোর নেই।

যুক্তির ধারাটি স্পষ্ট: ইউরোপ নিজস্ব বিধিবিধানে যুক্তরাষ্ট্রের আইনের বহির্দেশীয় প্রয়োগকে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করে; ১৯৯৬ সালে একই নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছিল। অথচ আজ ইরানের বিরুদ্ধে একই ধরনের নীতিকে সমর্থন করছে।

এই পরিবর্তন ইউরোপের কৌশলগত স্বাধীনতার দাবির বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয় এবং উত্তেজনা প্রশমনের বক্তব্যের সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপকে সমর্থনের দ্বৈত নীতিকে সামনে নিয়ে আসে।

বাকায়ি'র ভাষায়, “ইউরোপকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে-তারা স্বাধীনভাবে ভূমিকা পালন করবে, নাকি অন্যের নীতির প্রতিধ্বনিতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে যাবে যে সেই অনুসৃতিকে স্বাধীনতা বলে ভুল করবে।”

ইরানের প্রশ্নে ইউরোপ এখন পর্যন্ত যে পথ বেছে নিয়েছে, তা স্বাধীনতা নয়-প্রতিধ্বনি।#

পার্সটুডে/এনএম/২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।