বিশ্লেষণ | ন্যাটোর ঐতিহাসিক স্বীকারোক্তি: ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউরোপের সহযোগিতা প্রকাশ
পার্সটুডে— জাতিসংঘে ইসলামি প্রজাতন্ত্রী ইরানের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধি ‘গোলামহোসেইন দারজি’ জাতিসংঘের মহাসচিব ও নিরাপত্তা পরিষদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ন্যাটোর মহাসচিবের বৈরী বক্তব্যকে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছেন।
পার্সটুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিঠিতে উল্লেখ করা হয়: ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডে সহায়তার জন্য ইউরোপের সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রী ইরানের দৃষ্টিতে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বিদ্যমান অঙ্গীকারের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।
জাতিসংঘে ইসলামি প্রজাতন্ত্রী ইরানের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধি জোর দিয়ে বলেন, বক্তার অবস্থান এবং বক্তব্যের বিষয়বস্তু বিবেচনায় নিলে এটি স্পষ্ট হয় যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডে সহায়তার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ভূখণ্ড ও অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ইসলামি প্রজাতন্ত্রী ইরানের দৃষ্টিতে, এর ফলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা এবং সেইসঙ্গে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন উঠতে পারে—যদি তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সরকারের ইরানে সংঘটিত আগ্রাসন ও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা, প্রস্তুতি, সহায়তা বা বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত হয়ে থাকেন।
‘গোলামহোসেইন দারজি’ বলেন, এর আগে কিছু ইউরোপীয় দেশের ইরানের বিরুদ্ধে উল্লিখিত লঙ্ঘন এবং ২০২৫ সালে সংঘটিত লঙ্ঘনগুলোতে অংশগ্রহণ বা সহায়তার বিষয়ে যে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এসব বক্তব্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাই আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বের অংশ হিসেবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বিষয়টি গুরুত্ব ও জরুরিতার সঙ্গে পর্যালোচনা করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে ‘এপিক ফিউরি’ নামে পরিচালিত অভিযানের মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সরকারের যুদ্ধ শুরু হয়। এটি কেবল একটি দ্বিপক্ষীয় সংঘাত ছিল না; বরং ওয়াশিংটনের শক্তি প্রদর্শনে নেটোর সামরিক অবকাঠামোর পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারের একটি দৃষ্টান্ত ছিল। এই বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে নেটোর মহাসচিব মার্ক রুটের স্পষ্ট বক্তব্যকে উল্লেখ করা হচ্ছে। তিনি জানান, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইউরোপীয় ঘাঁটি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে সহায়তার জন্য প্রায় ৫ হাজারটি উড্ডয়ন পরিচালিত হয়েছে এবং এরপর প্রকৃত সংখ্যা ‘সম্ভবত আরও অনেক বেশি’ হয়েছে। নেটোর নিজস্ব প্রকাশিত ট্রান্সক্রিপ্টেও রুটে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইউরোপীয় ঘাঁটি থেকে ‘৫,০০০ সর্টি’ পরিচালনার কথা বলেছেন।
এই বক্তব্যের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্রী ইরান জাতিসংঘের মহাসচিব ও নিরাপত্তা পরিষদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানায়। তেহরানের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি কেবল একটি সামরিক পরিসংখ্যান নয়; বরং এমন একটি আগ্রাসনে ইউরোপের কাঠামোগত অংশগ্রহণের প্রমাণ, যা ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী জাতিসংঘ সনদের ২ নম্বর অনুচ্ছেদের ৪ নম্বর ধারা এবং ‘আগ্রাসন নিষিদ্ধকরণ’-এর বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক আইনি নীতি লঙ্ঘন করেছে।
এই অংশগ্রহণের মাত্রা শুধু ৫ হাজার উড্ডয়নের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের মহাপরিদর্শকের প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখাটিতে বলা হয়েছে, ‘এপিক ফিউরি’ অভিযানের মূল পর্যায়ে মার্কিন বাহিনী প্রায় ৩৬ হাজার যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন পরিচালনা করে এবং ইরানে ১৩ হাজার ৫০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। একই সময়ে এই অভিযানে সহায়তার জন্য ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা ওই অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়। জার্মানির রামস্টাইন, ইতালির আভিয়ানো, যুক্তরাজ্যের ফেয়ারফোর্ড এবং পর্তুগাল, ফ্রান্স ও গ্রিসের বিভিন্ন ঘাঁটিসহ ১১টি ইউরোপীয় ঘাঁটি অভিযান পরিচালনা ও অব্যাহত রাখার নেটওয়ার্ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বিশেষভাবে রামস্টাইন ঘাঁটি ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে মার্কিন হামলাকারী ড্রোনের নিয়ন্ত্রণ ও কমান্ড কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে জার্মান সরকার এই যুক্তি দিয়ে দায় এড়িয়েছে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘাঁটি ব্যবহারে কোনো সীমাবদ্ধতা আরোপ করেনি এবং তাই তারা যুদ্ধের পক্ষ নয়।
তবে এই যুদ্ধে ইউরোপের অবস্থান একরকম ছিল না। একদিকে মহাদেশটির সামরিক অবকাঠামো মার্কিন অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছে, অন্যদিকে কয়েকটি ইউরোপীয় সরকার প্রকাশ্যে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। স্পেন শুধু তার সামরিক ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি, বরং প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকে ‘বড় ভুল’ বলে অভিহিত করেন।
ইতালিও জোর দিয়ে জানায় যে, ‘তারা যুদ্ধাবস্থায় নেই এবং যুদ্ধে প্রবেশ করতে চায় না’; ফলে দেশটি প্রকাশ্যভাবে আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। যুক্তরাজ্যে ইউগভের পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৪৯ শতাংশ উত্তরদাতা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করেছেন, যেখানে মাত্র ২৮ শতাংশ এর সমর্থন করেছেন। স্পেনে এই বিরোধিতার হার ছিল ৬৮ শতাংশ। লেখাটিতে বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, এই বিভাজন শীতল যুদ্ধের অবসানের পর নেটোর অভ্যন্তরে অন্যতম গভীর আস্থার সংকট সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে ন্যাটো মহাসচিবের এই স্বীকারোক্তির গুরুতর তাৎপর্য রয়েছে বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৭৪ সালের জাতিসংঘের আগ্রাসনের সংজ্ঞা সংক্রান্ত কনভেনশনে বলা হয়েছে, কোনো তৃতীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালানোর উদ্দেশ্যে অন্য একটি রাষ্ট্রকে নিজের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দেওয়াও আগ্রাসনের একটি রূপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৩৩১৪ নম্বর প্রস্তাবের উল্লেখ করে জোর দিয়ে বলেন, যেসব রাষ্ট্র তাদের ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারের জন্য দিয়েছে, তারা দায়বদ্ধতা এড়াতে পারে না এবং ‘এই অংশগ্রহণের জবাবদিহি হবে’। জাতিসংঘে ইরানের পাঠানো চিঠিতেও ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের ‘ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়বদ্ধতার’ কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি তারা আগ্রাসন ও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা, প্রস্তুতি, সহায়তা বা বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত থাকেন।
এই অভিযানের মানবিক মূল্য পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে। পেন্টাগন ‘এপিক ফিউরি’ অভিযানে ১৪ জন মার্কিন সেনা নিহত ও ৪১৮ জন আহত হওয়ার সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। তবে সংঘাত শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের মোট নিহতের সংখ্যা ১৮ এবং আহতের সংখ্যা ৮৬১-এ পৌঁছেছে বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে জাতিসংঘে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানে ৫ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শত শত নারী ও শিশু রয়েছে।
লেখাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ন্যাটোর মহাসচিবের ইউরোপীয় ভূখণ্ড থেকে ৫ হাজার উড্ডয়নের স্বীকারোক্তি এমন একটি বাস্তবতার পর্দা উন্মোচন করেছে, যা এর আগেও বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও আইনি নথির মাধ্যমে অনুসরণ করা সম্ভব ছিল: ২০২৬ সালে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউরোপ কেবল নিরপেক্ষ দর্শক ছিল না, বরং লেখাটির ভাষ্য অনুযায়ী আগ্রাসনের অবকাঠামোর একটি অংশ ছিল।
এই বাস্তবতার পাশাপাশি ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং কিছু ইউরোপীয় দেশের সহযোগিতায় অস্বীকৃতি ট্রান্সআটলান্টিক জোটটির একটি জটিল চিত্র তুলে ধরে। এমন একটি জোট, যেখানে যৌথ সামরিক অবকাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়, কিন্তু এর আইনি ও মানবিক মূল্য পুরো ইউরোপের ওপর বর্তায়।#
পার্সটুডে/এমবিএ/২৮
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।