উত্তেজনাপূর্ণ ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড
চরম নাটকীয়তা ও উত্তেজনা ভরা ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের বিশ্বকাপ জিতেছে স্বাগতিক ইংল্যান্ড। এ নিয়ে টানা তিন আসরে কোনো স্বাগতিক দেশ শিরোপা জয়ের হ্যাটট্রিক করল। এর আগে তিনবারের ফাইনালে রান তাড়া করতে গিয়েই হেরেছিল ইংলিশরা। কিন্তু এবার এই ভুলের পুনরাবৃত্তি হতে দেননি জশ বাটলার-বেন স্টোকরা। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ২৩ বছর পর বিশ্বকাপে নতুন কোনো দলকে চ্যাম্পিয়ন হতে দেখলো ক্রিকেট বিশ্ব।
রোববার লর্ডসে টাই হয় ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার নির্ধারিত ৫০ ওভারের ফাইনাল ম্যাচটি। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষ হয় সমতায়। কিউইদের ৮ উইকেটে ২৪১ রানের জবাবে ইংলিশরাও গুটিয়ে যায় ২৪১ রানে। তাতে ম্যাচ গড়ায় সুপার ওভারে।
সুপার ওভারে ইংল্যান্ডের বেন স্টোকস ও জস বাটলার মিলে তোলেন ১৫ রান। কোনো উইকেট হারায়নি তারা। জবাব দিতে নেমে নিউজিল্যান্ডও কোনো উইকেট না হারিয়ে ঠিক ১৫ রান তোলে জিমি নিশাম ও মার্টিন গাপটিলের ব্যাটে চড়ে। তাতে ফের টাই হয় ম্যাচ! কিন্তু বেশি বাউন্ডারি হাঁকানোর সুবাদে প্রথমবারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় ইংল্যান্ড। নিউজিল্যান্ডের ১৪ চার ও ২ ছয়ের বিপরীতে তাদের চার ২২টি ও ছয় ২টি। ট্রফির ভাগ্য লেখা হয়েছে এখানেই।
এর আগে হালকা বৃষ্টির কারণে ১৫ মিনিট দেরিতে শুরু হওয়া ম্যাচে টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামে নিউজিল্যান্ড। তবে ইংলিশ পেসারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের বিপরীতে খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি তারা। নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৪১ রান তোলে কিউইরা।
শুরুর দিকে মার্টিন গাপটিলের বিদায়ের পর আরেক ওপেনার হেনরি নিকোলস ও অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন মিলে ৯৮ বলে ৭৪ রানের জুটিতে নিউজিল্যান্ডকে গড়ে দেন বড় সংগ্রহের ভিত। কিন্তু বাকি ব্যাটসম্যানরা কাজে লাগাতে পারেননি সুযোগ। পাঁচে নামা টম ল্যাথামের কল্যাণে আড়াইশোর কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে নিউজিল্যান্ড।
নিকোলস ৫৫, ল্যাথাম ৪৭ ও উইলিয়ামসন ৩০ রান করেন। ইংল্যান্ডের পক্ষে সফল বোলার ওকস ও প্লাঙ্কেট। দুজনেই নেন সমান ৩টি করে উইকেট। সেমিফাইনালে জয়ের নায়ক ওকসের খরচা ৩৭ রান। প্লাঙ্কেট দেন ৪২ রান। ১টি করে উইকেট দখল করেন মার্ক উড ও জোফরা আর্চার।
লক্ষ্য তাড়ায় ইনিংসের ২৪তম ওভারে দলীয় ৮৬ রানের মধ্যে ৪ উইকেট হারায় ইংল্যান্ড। দলকে চাপে ফেলে একে একে বিদায় নেন জেসন রয়, জো রুট, জনি বেয়ারস্টো ও অধিনায়ক ইয়ন মরগান। এরপর জুটি বাঁধেন বেন স্টোকস ও জস বাটলার। পঞ্চম উইকেটে তারা যোগ করেন ১৩০ বলে ১১০ রান। দুজনেই তুলে নেন হাফসেঞ্চুরি। এই জুটিতে মারমুখী ভূমিকায় থাকা বাটলারের অবদান ৬০ বলে ৫৯ রান।
৪৫তম ওভারে লোকি ফার্গুসনের স্লোয়ার ডেলিভারিতে বদলি ফিল্ডার টিম সাউদির হাতে ক্যাচ দিয়ে আউট হন বাটলার। তখন বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের জন্য ইংলিশদের দরকার দাঁড়ায় ৩১ বলে ৪৬ রান। নিশ্চিতভাবে ইংল্যান্ডের দিকে হেলে পড়া ম্যাচে আসে নতুন মোড়।
একপ্রান্ত আগলে বুঝেশুনে ব্যাটিং করতে থাকা স্টোকসকে সঙ্গ দিতে পারেননি ক্রিস ওকস। এক ওভার পর ফের বল হাতে নিয়ে নিজের তৃতীয় উইকেটের দেখা পান ফার্গুসন। ওই ওভারে মাত্র ৫ রান দেন এই কিউই পেসার।
শেষ ২ ওভারে উত্তেজনার মাত্রা চরমে পৌঁছায়। ইংল্যান্ডের প্রয়োজন তখন ২৪ রান, নিউজিল্যান্ডের ৪ উইকেট। জিমি নিশামের করা ৪৯তম ওভারের তৃতীয় বলে ফিরে যান লিয়াম প্লাঙ্কেট। পরের বলেই ফিরতে পারতেন স্টোকসও। কিন্তু সীমানার কাছাকাছি তার ক্যাচ লুফে নিলেও শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে লাইনে পা ফেলে দেন ট্রেন্ট বোল্ট।
ওভারের শেষ বলে আবার উল্লাস নিশামের। উল্লাস নিউজিল্যান্ডের। ইংল্যান্ড শিবিরে পিনপতন নীরবতা। বোল্ড হন জোফরা আর্চার।
নাটকের শেষ অঙ্কটা মঞ্চায়ন হয় ম্যাচের শেষ ওভারে। ১৫ রানের সমীকরণ। ২ উইকেটের সমীকরণ। বোল্টের ওভারের প্রথম দুই বল ডট। তৃতীয় বলে ছক্কা মারেন স্টোকস। চতুর্থ বলেও আসে ছয় রান। মার্টিন গাপটিলের থ্রো ডাবল নিতে থাকা স্টোকসের ব্যাটে লেগে মাঠের বাইরে চলে যায়! শেষ ২ বলে ৩ রান দরকার পড়ে স্বাগতিকদের। কিন্তু স্নায়ুচাপ ধরে রেখে দুর্দান্ত দুটি ডেলিভারি দেন বোল্ট। ফলে দুটি বলেই একটি করে রানের বেশি নিতে পারেননি স্ট্রাইকে থাকা স্টোকস।
আর উল্টো ডাবল নিতে গিয়ে রানআউট হয়ে যান যথাক্রমে আদিল রশিদ ও মার্ক উড। পুরো ৫০ ওভার ওভার খেলে ইংল্যান্ড অলআউট হয় ২৪১ রানেই। স্টোকস অপরাজিত থাকেন ৯৮ বলে ৮৪ রানে।
ফাইনালে ম্যান অব দ্য ম্যাচ পুরস্কার পান বেন স্টোকস। আর বিশ্বকাপের প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট দেয়া হয়েছে নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনকে। যদিও এ পুরস্কারটি পাওয়ার দাবিদার ছিলেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। এবারের বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে ৬০৬ রান করার পাশাপাশি বল হাতেও শিকার করেন ১১ উইকেট। অথচ উইলিয়ামসনের রান ছিল মাত্র ৫৭৮ রান। এ নিয়ে বাংলাদেশি সমর্থকদের মাঝে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১৫
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।