গাজাবাসীকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের চেষ্টা: ট্রাম্প কি যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত হতে পারেন?
https://parstoday.ir/bn/news/event-i146748-গাজাবাসীকে_জোরপূর্বক_উচ্ছেদের_চেষ্টা_ট্রাম্প_কি_যুদ্ধাপরাধী_সাব্যস্ত_হতে_পারেন
সাইফুল খান: ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইসরাইলি সামরিক অভিযান, অবরোধ এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ফলে গাজার অধিকাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। লক্ষাধিক মানুষ হতাহত হয়েছেন এবং প্রায় ২০ লাখ মানুষ গৃহহীন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে।
(last modified 2026-03-14T14:53:49+00:00 )
ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০২৫ ১৭:২৫ Asia/Dhaka
  • ডোনাল্ড ট্রাম্প
    ডোনাল্ড ট্রাম্প

সাইফুল খান: ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইসরাইলি সামরিক অভিযান, অবরোধ এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ফলে গাজার অধিকাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। লক্ষাধিক মানুষ হতাহত হয়েছেন এবং প্রায় ২০ লাখ মানুষ গৃহহীন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে।

এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহলে একটি নতুন বিতর্ক দেখা দিয়েছে গাজাবাসীকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে সেখানে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা। সম্প্রতি দ্বিতীয় দফার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু ঘনিষ্ঠ মহল ও রিপাবলিকানদের মধ্যে এমন একটি পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে, যেখানে গাজার জনগণকে মিসর, জর্ডান বা অন্যত্র সরিয়ে দিয়ে গাজা পুনর্গঠন করার কথা বলা হচ্ছে!

এটি আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং যুদ্ধাপরাধের সংজ্ঞার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় এবং ট্রাম্প এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন, তাহলে কি তিনি যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হতে পারেন? এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন কী বলে?

গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ: আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ

গাজার জনগণকে জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়া এবং সেখানে নতুন বসতি বা অবকাঠামো নির্মাণ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ ধরনের পদক্ষেপকে যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং জাতিগত নির্মূলের (Ethnic Cleansing) শামিল বলে মনে করে।

১. চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন (১৯৪৯)
●    চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ৪৯তম অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে কোনো দখলদার শক্তি দখলকৃত অঞ্চলের জনগণকে জোরপূর্বক সরিয়ে দিতে পারে না।
●    এটি ফিলিস্তিনিদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গাজা ও পশ্চিম তীর আন্তর্জাতিকভাবে অধিকৃত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত।
●    ইসরাইল যদি গাজার জনগণকে জোর করে অন্যত্র সরিয়ে নেয়, তবে এটি আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

২. রোম সংবিধি ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC)
●    ১৯৯৮ সালের রোম সংবিধির ৮(২)(a)(vii) ধারা অনুযায়ী, দখলকৃত অঞ্চল থেকে জনগণকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
●    এছাড়া, ৮(২)(b)(viii) ধারায় বলা হয়েছে, দখলকৃত অঞ্চলে দখলদার শক্তি যদি নিজেদের জনগণকে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য পাঠায় বা অন্য জাতিগোষ্ঠীর লোকজনকে সরিয়ে দেয়, তবে তা যুদ্ধাপরাধের শামিল হবে।
●    যদি ট্রাম্প বা তার প্রশাসন এই পরিকল্পনার পক্ষে অবস্থান নেয় বা কোনোভাবে সহায়তা করে, তাহলে যুদ্ধাপরাধের সহায়তাকারী (Accomplice to War Crimes) হিসেবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হতে পারে।

৩. জাতিসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত নীতিমালা
●    জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার বলেছে যে গাজার জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যা বা তাদের উচ্ছেদ মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
●    গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে নেওয়ার যেকোনো পরিকল্পনা জাতিগত নির্মূল (Ethnic Cleansing) ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের (Crime Against Humanity) অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা ও সম্ভাব্য অভিযোগ

ট্রাম্প কেন এ বিতর্কের কেন্দ্রে?
 মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসন বরাবরই ইসরাইলপন্থী নীতি অনুসরণ করেছে। তার প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায়-
     ১.   ২০১৭ সালে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ছিল।
     ২.    ২০২০ সালে গোলান মালভূমির ওপর ইসরাইলের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
     ৩.    ট্রাম্পের সময়কালে ফিলিস্তিনিদের জন্য মার্কিন সহায়তা প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এছাড়া, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কিছু সহযোগী গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে সেখানে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর এসেছে।

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনার সম্ভাবনা
যদি গাজাবাসীকে উচ্ছেদ করে নতুন বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় এবং ট্রাম্পের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা পাওয়া যায়। তাহলে তিনি যুদ্ধাপরাধের সহায়তাকারী (Accomplice to War Crimes) হিসেবে অভিযুক্ত হতে পারেন।
●    আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করতে পারে।
●    ট্রাম্প বা তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব উত্থাপন করা হতে পারে।
●    ইউরোপের কোনো দেশ বা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে পারে, যেমনটি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ক্ষেত্রে করা হয়েছে।
তবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য নয় এবং যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত তার নাগরিকদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার মেনে নেয় না। ফলে, ট্রাম্পের বিচারিক প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।

গাজার জনগণের জন্য এর অর্থ কী?
গাজাবাসী ইতোমধ্যেই ইসরাইলি অবরোধ, বোমা হামলা এবং মানবিক সংকটে ভুগছে। যদি তাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়, তবে-
●    এটি একটি মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করবে, কারণ গাজার জনগণের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।
●    এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে, এটি ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য নষ্ট করার আরেকটি কৌশল হবে।
●    ইসরাইল দীর্ঘমেয়াদে গাজাকে দখল করে সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপনের চেষ্টা করতে পারে, যা আন্তর্জাতিকভাবে অবৈধ বলে বিবেচিত হবে।

উপসংহার
গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও সেখানে নতুন বসতি বা অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এটি যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং জাতিগত নির্মূলের অংশ হতে পারে।
যদি ট্রাম্প বা তার সহযোগীরা এই পরিকল্পনার পক্ষে কাজ করেন। তাহলে তাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করার সুযোগ আছে এবং হতেও পারে। তবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার প্রতি বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা ট্রাম্পের বিচার প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলবে। তবে, এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সোচ্চার হওয়া জরুরি। যাতে গাজার জনগণের অধিকার রক্ষা করা যায় এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অন্যায্য উচ্ছেদ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হয়।# 

লেখক: ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক 

পার্সটুডে/এমএআর/৬