'ইমামের কাছে আমাদের অঙ্গীকার: প্রতিশোধ, প্রতিশোধ'
তেহরানে শহীদ ইমামের দাফনের চেহলাম-মহাসমাবেশে জনতার শ্লোগান: প্রতিশোধ, প্রতিশোধ
-
তেহরানের প্রধান ধর্মীয়-সামাজিক সমাবেশ কেন্দ্র ইমাম খোমেনী (র) গ্র্যান্ড মোসাল্লায় শহীদ বিপ্লবী নেতার দাফন-পরবর্তী চল্লিশা অনুষ্ঠানে উপস্থিত একদল নারী
পার্সটুডে: মার্কিন-ইসরায়েলি নৃশংস ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শহীদ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ইমাম আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীর দাফন অনুষ্ঠান-পরবর্তী চল্লিশ দিন পূর্তি তথা চেহলাম বা চল্লিশা উপলক্ষে বিপুল সংখ্যক জনগণের উপস্থিতিতে তেহরানের ইমাম খোমেনী (র) গ্র্যান্ড মোসাল্লায় অনুষ্ঠিত এক মহাসমাবেশে প্রতিশোধের দাবি ও অব্যাহত প্রতিরোধের অঙ্গীকার প্রধান শ্লোগান হয়ে উঠেছে।
সেখানে শোকাহতরা ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সাবেক নেতার স্মরণের পাশাপাশি প্রতিরোধ, জাতীয় ঐক্য ও ইরানের প্রতিরক্ষার নীতিমালার প্রতি সমর্থন ও গুরুত্ব-আরোপ পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
ইসলামি বিপ্লবের বর্তমান নেতা সাইয়্যেদ মুজতাবা খামেনেয়ীর আহ্বানে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
এই সমাবেশে সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারাসহ ইরানের ঊর্ধ্বতন বা শীর্ষ পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা, শহীদ নেতার পরিবারের সদস্যবৃন্দ এবং সর্বস্তরের বিপুল সংখ্যক জনগণ উপস্থিত ছিলেন।
এই আধ্যাত্মিক ও পবিত্র অনুষ্ঠানে উপস্থিতদের মধ্যে ছিলেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ রেজা আরেফ, জাতীয় সংসদের স্পিকার মুহাম্মাদ বাকের কলিবফ এবং বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হুসেইন মুহসেনি এজেয়ি। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ইমাম খোমেইনি (রহ.)-এর মাজারের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ হাসান খোমেইনী।
সমাবেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা এসেছে বারবার প্রতিশোধের আহ্বানের মাধ্যমে।
শোকাহতরা স্লোগান দেন "আমাদের কথা একটাই: প্রতিশোধ, প্রতিশোধ" এবং "ইমামের কাছে আমাদের অঙ্গীকার: প্রতিশোধ, প্রতিশোধ"। সমাবেশ শেষ হয় "হে জনতা, হে অভিজাতগণ! হাইয়া আলাল-কিসাস তথা হত্যার প্রতিশোধ নিতে এগিয়ে আসুন" স্লোগানের মাধ্যমে, যা প্রতিশোধের আহ্বান জানায়।
অন্যান্য স্লোগানের মধ্যে ছিল " ধ্বংস হোক আমেরিকা বা আমেরিকার প্রতি মৃত্যু", " ধ্বংস হোক ইসরাইল" এবং "কখনও নয় অপমান বা হাইহাত মিন আয-যিল্লা", যা বশ্যতা প্রত্যাখ্যান এবং ইরানের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা প্রতিরোধের নীতিগুলোর ওপর জোর দেয়।
অংশগ্রহণকারীরা ইরানি পতাকা, "ইয়া লাসারাল-হুসাইন" ও "ইয়া লাসারাল-খামেনেয়ী" স্লোগানসম্বলিত লাল পতাকা এবং ইমাম খামেনেইয়ের ছবি বহন করেন। লাল পতাকা ও স্লোগানগুলো সমাবেশকে তার ধর্মীয় ও স্মরণানুষ্ঠানের মাত্রার পাশাপাশি একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক চরিত্র প্রদান করেছে।
এই সমাবেশ শুধু শোকের একটি অনুষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত হয়নি, একইসঙ্গে ইমাম খামেনেয়ীর নেতৃত্বের বছরগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট অঙ্গীকারগুলোর নবায়ন বা পুনর্নিশ্চিতকরণের সমাবেশ হিসেবেও ভূমিকা রেখেছে। বক্তারা জাতীয় ঐক্য, প্রতিরোধ, ইরানি জনগণের সেবা এবং শহীদ নেতার পথ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
ইরানের জুমার নামাজের ইমামদের নীতি পরিষদের প্রধান, হুজ্জাতুল ইসলাম হাজ আলি আকবরী সমাবেশে বলেছেন, ইমাম খামেনেয়ীর শাহাদাত দশকের পর দশকের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি। তিনি তাঁর শাহাদাতকে এমন একটি মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন যা ইরানি সমাজে প্রতিরোধের চেতনাকে শক্তিশালী করেছে।
আকবরী ইমাম খামেনেয়ীর উত্তরাধিকারকে দৃঢ়তা, প্রতিরোধ এবং সম্মিলিত দায়বদ্ধতার প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেন এবং শোকাহতদের বলেছেন যে তাঁর শাহাদাতকে সংগ্রামের সমাপ্তি নয় বরং তাঁর সংগ্রামের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা উচিত।
এই সমাবেশ তীব্র আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হল এবং তাই তা ইমাম খামেনেয়ীর শাহাদাতের জবাব দেয়ার দাবির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে।
প্রতিশোধের দাবির বারবার উল্লেখ ছিল এই সমাবেশের সবচেয়ে বিশিষ্ট দিকগুলোর অন্যতম যা স্মরণানুষ্ঠানকে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভের একটি প্রকাশ্য অভিব্যক্তিতে রূপান্তর করেছে।
তবে অনেক অংশগ্রহণকারীর জন্য, এই সমাবেশ ধারাবাহিকতা সম্পর্কেও একটি বার্তা বহন করে। জানাজা অনুষ্ঠানের ৪০ দিন পর, শোকাহতরা দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে একজন নেতাকে শারীরিকভাবে হারানোর অর্থ তাঁর সাথে সম্পর্কিত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নীতিগুলোর অবসান নয়।
শোকাহতদের মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রজন্মের উপস্থিতি এই বার্তাটিকে আরও জোরালো করেছে। বয়স্ক অংশগ্রহণকারীরা ইমাম খামেনেয়ীর ছবি বহন করেন তরুণ ইরানিদের সাথে, যাকে আয়োজক ও বক্তারা ইমামের উত্তরাধিকার নতুন প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর বলে তুলে ধরেছেন।
সমাবেশে প্রতিরোধের ওপর জোর দেয়াটা ইরানের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি দীর্ঘস্থায়ী বিষয়কে তুলে ধরে, যার মর্ম হল: জাতীয় স্বাধীনতা বজায় রাখা, বহিরাগত চাপ বা হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করা এবং ইরানি জাতির বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি সন্ত্রাসী যুদ্ধের মুখে ঐক্য রক্ষা করা।
মুসাল্লায় সমাবেশ শেষ হলে, জনতা তাদের স্লোগান পুনরাবৃত্তি করেন এবং ইরানি পতাকা ও ইমাম খামেনেয়ির ছবিও বহন করেন। অন্য কথায় এই চেহলাম-সমাবেশ আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর শাহাদাতকে একটি রাজনৈতিক যুগের সমাপ্তি হিসেবে নয়, বরং এমন একটি মুহূর্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছে যার জন্য নবায়িত ঐক্য, প্রতিরোধ এবং পদক্ষেপ জরুরি।
একই উপলক্ষে আরেকটি অনুষ্ঠান হবে আজ বুধবার (১৯ আগস্ট), মাগরিব ও এশার নামাজের পর কোম শহরের পবিত্র হজরত মাসুমেহ (সা.)-এর পবিত্র মাজারে শহীদ নেতার পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে।
এছাড়াও, বিপ্লবের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার পক্ষ থেকে শহীদ বিপ্লবী নেতার চল্লিশা উপলক্ষে আরেকটি স্মরণানুষ্ঠান আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) মাগরিব ও এশার নামাজের পর পবিত্র ইমাম রেজা (আ.)-এর মাজারে এবং উম্মতের শহীদ নেতার সমাধির পাশে শহীদ বিপ্লবী নেতার পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে উদযাপনের কথা রয়েছে।
একই দিনে (বৃহস্পতিবার) বিকেলে সারাদেশে ব্যাপক স্মরণানুষ্ঠান করা হবে বিপ্লবের নেতার প্রতিনিধিদের উদ্যোগে সকল প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহরগুলোতে এবং ইরানের অন্যান্য শহর, জেলা ও গ্রামে জুমার ইমাম, আলেম ও ইরানি জনগণের উপস্থিতিতে।#
পার্সটুডে/এমএএইচ/১৯
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন