ইরানে কথিত পানি সংকট নিয়ে স্লোভেনীয় দার্শনিকের বিতর্কিত মন্তব্য ও বাস্তবতা
https://parstoday.ir/bn/news/world-i163728-ইরানে_কথিত_পানি_সংকট_নিয়ে_স্লোভেনীয়_দার্শনিকের_বিতর্কিত_মন্তব্য_ও_বাস্তবতা
পার্সটুডি- স্লোভেনীয় দার্শনিক স্লাভয় জিজেক এক নিবন্ধে ইরানের পানি সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বেশ কিছু বিতর্কিত ও বাস্তবতাবিবর্জিত মন্তব্য করেছেন।
(last modified 2026-10-06T14:54:51+00:00 )
অক্টোবর ০৬, ২০২৬ ১৮:৩৫ Asia/Dhaka
  • স্লোভেনীয় দার্শনিক স্লাভয় জিজেক
    স্লোভেনীয় দার্শনিক স্লাভয় জিজেক

পার্সটুডি- স্লোভেনীয় দার্শনিক স্লাভয় জিজেক এক নিবন্ধে ইরানের পানি সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বেশ কিছু বিতর্কিত ও বাস্তবতাবিবর্জিত মন্তব্য করেছেন।

পার্সটুডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ইউরোপিয়ান গ্র্যাজুয়েট স্কুল’-এর দর্শনের অধ্যাপক স্লাভয় জিজেক ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর কোরিয়ান টাইমস-এ প্রকাশিত ‘When Communism Is the Only Option’ অর্থাৎ ‘যখন কমিউনিজমই একমাত্র বিকল্প’ শিরোনামের এক অদ্ভুত নিবন্ধে ইরানে, বিশেষ করে তেহরানে, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি এটিকে আধুনিক সমাজগুলোর জন্য অস্তিত্বের হুমকির একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

জিজেক বিস্ময়করভাবে দাবি করেছেন, কেবল জরুরি অবস্থা ঘোষণা, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জনসাধারণের নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার মাধ্যমেই সামাজিক বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব। তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে এই পদ্ধতিকে ‘প্রয়োজনীয় কমিউনিজম’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর দাবি, ইরানসহ বিভিন্ন দেশে পানি সংকটের সমাধান হতে পারে এক ধরনের ‘কমিউনিজম’।

এই ইউরোপীয় দার্শনিকের ইরান ও বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন।

১. জিজেক বাস্তব পরিস্থিতি সরেজমিনে যাচাই করতে ইরান সফর না করেই পশ্চিমা গণমাধ্যমের বিভ্রান্তিকর ও পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য এবং উপস্থাপনার ওপর ভিত্তি করে তেহরানের পানি পরিস্থিতি ও সেখানকার মানুষের জীবন নিয়ে অদ্ভুত কিছু দাবি করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—হাজার হাজার তেহরানবাসী নাকি উত্তরাঞ্চল ও কাস্পিয়ান সাগরের দিকে পালিয়ে গেছে এবং এই সংখ্যা লাখ বা কোটিতে পৌঁছালে তুরস্ক ও ইউরোপের দিকে ব্যাপক অভিবাসনের ঢল নামতে পারে।

তেহরানের মানুষের উত্তরাঞ্চলে যাওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে জিজেকের ধারণা একেবারেই হাস্যকর। তেহরানবাসীর সাপ্তাহিক ছুটিতে উত্তরাঞ্চল ও কাস্পিয়ান সাগরের উপকূলে ভ্রমণকে তিনি পানির সংকটের কারণে শহর থেকে মানুষের ‘পালিয়ে যাওয়া’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

যখন ইরানের পানি পরিস্থিতি, বিশেষ করে তেহরানের পানি সংকটের মতো একটি বিষয় সম্পর্কে জিজেকের প্রাথমিক ধারণাই ভুল, তখন তিনি কীভাবে তাঁর ভাষায় ‘প্রয়োজনীয় কমিউনিজম’—অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের ওপর জনসাধারণের নিয়ন্ত্রণ এবং টিকে থাকার জন্য জরুরি ব্যবস্থাপনা—জাতীয় সমাধানের প্রস্তাব দেন?

বরং তাঁর উচিত ইরান, বিশেষ করে তেহরান সফর করা এবং বাস্তব পরিস্থিতি নিজের চোখে দেখার পর কোনো সমাধান প্রস্তাব করা।

২. জিজেক ইরানের পানি সংকটের বিভিন্ন দিক, কারণ ও পরিণতি নিয়ে তাঁর অনুমাননির্ভর বিশ্লেষণ দীর্ঘ করেছেন। কিন্তু একই সময়ে ইউরোপ ও আমেরিকার পানি পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি প্রায় কিছুই বলেননি। তিনি কেবল মিসর বা আফগানিস্তানের মতো কয়েকটি দেশের পানি সংকটের কথা উল্লেখ করেছেন।

অথচ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং চরম জলবায়ু পরিস্থিতির বিস্তারের ফলে খরা এখন আর কোনো নির্দিষ্ট দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো ঘটনা নয়। ইউরোপ থেকে আফ্রিকা, চীন থেকে দক্ষিণ আমেরিকা—বিভিন্ন দেশই পানি সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে। তবে এই সংকট মোকাবিলায় প্রতিটি দেশের পদক্ষেপ ও কৌশল ভিন্ন।

পশ্চিমা দেশগুলোও দারিদ্র্য ও গৃহহীনতার মতো নানা সমস্যার পাশাপাশি বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, ক্রমবর্ধমান পানিসম্পদের ঘাটতি এবং খরার মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইংল্যান্ডে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার কারণে সরকার জনগণকে পানি ব্যবহারে সতর্ক ও সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশাল দেশেও পানি সংকট, বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়ার মতো পশ্চিমাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোতে, একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন অনেক এলাকাতেও খরা দেখা দিয়েছে, যেগুলো আগে এ ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গে খুব একটা পরিচিত ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া থেকে শুরু করে ইউরোপের বড় বড় নদী শুকিয়ে যাওয়া, হর্ন অব আফ্রিকার মানবিক সংকট এবং চীনে এর অর্থনৈতিক প্রভাব—আজকের খরার প্রভাব ভৌগোলিক সীমারেখা ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পানি সম্পদের ঘাটতি ও খরা মোকাবিলার সমাধান বিভিন্ন দেশে এক নয়। প্রতিটি দেশের ভৌগোলিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে এর সমাধানের পথও ভিন্ন হতে পারে।

শেষ কথা-

ইতোমধ্যে পশ্চিমা বিশ্বের বহু দার্শনিক ও চিন্তাবিদ জিজেকের চিন্তাধারা, বিশ্বাস ও বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন। অনেকেই তাঁর লেখাকে অবাস্তব এবং অর্থহীন বলে মনে করেন।

আমেরিকান চিন্তাবিদ ও ভাষাবিদ নোয়াম চমস্কি দার্শনিক জিজেকের লেখাকে ‘ফাঁপা ভঙ্গিমা’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, জিজেকের কাজকে মোটেও গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত নয়। ব্রিটিশ দার্শনিক জন গ্রেও দার্শনিক জিজেকের অর্থহীন ও ফাঁপা বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন।

মনে হচ্ছে, আলোচিত এই নিবন্ধেও জিজেক একই ধরনের অর্থহীন ও বিষয়বস্তুহীন পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। ইরানের পানি সংকটের সমাধান হিসেবে তাঁর প্রস্তাবিত ‘কমিউনিস্ট’ সমাধান সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে তৈরি হওয়ার পরিবর্তে নানা ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর উপাত্ত সংগ্রহ এবং সেখান থেকে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ফল বলেই মনে হয়।#

পার্সটুডে/এমআরএইচ/৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।