সন্তানকে মানুষ করা নারীর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পেশা: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা
-
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী
নারীর যোগ্যতা ও নারী-মুক্তি নিয়ে অনেক কথাই বলা হয়েছে আধুনিক যুগে। আর তারই ধারাবাহিকতায় এ বিষয়ে চিন্তাবিদদের অনেক মন্তব্য প্রায়ই শোনা যায়।
পাশ্চাত্য এমন একটা ধারণা প্রচার করে আসছে যে ইসলাম নারীকে যথাযোগ্য সম্মান ও অধিকার দেয় না বরং পশ্চিমা লিবারেল বা ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শ নারীকে সমানাধিকার দেয় ও লৈঙ্গিক ভারসাম্যের কথা বলে। অথচ বাস্তবতা হল ইসলামই নারীকে সর্বোচ্চ সম্মান ও অধিকার দিয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী নারীর মর্যাদা ও সম্মান সম্পর্কে নানা সময়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নারীর মর্যাদা ও মুক্তি প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছেন: মানব সমাজকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ইহুদিবাদীদের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই খুব সম্ভবত পশ্চিমা দুনিয়ায় নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
পাশ্চাত্যে ‘লিঙ্গ সমতা’ ও ‘লিঙ্গভিত্তিক ন্যায়বিচার’ নামের যে শ্লোগান দেয়া হচ্ছে সেকথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান দিয়ে ন্যায়বিচার চিনতে হয়। নারীকে যিনি সৃষ্টি করেছেন নারীর চলার পথের জন্য প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা তাঁর চেয়ে ভালো আর কেউ দিতে পারে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেন, যেসব পশ্চিমা চিন্তাবিদ একদিন লিঙ্গ সমতার দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন তারা আজ এর কুফল দেখে অনুতাপ প্রকাশ করছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা দো-জাহানের মহিয়সী নারী হযরত ফাতিমা জাহরা (সা. আ.)কে প্রকৃত নেতা, আদর্শ মা ও আদর্শ সহধর্মিণী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, হযরত ফাতিমা হচ্ছেন মুসলিম নারীর জন্য পরিপূর্ণ আদর্শ এবং মানবজাতির একজন প্রকৃত পথ-প্রদর্শক। তিনি যুগের চাহিদার আলোকে এই মহিয়সী নারীর চিন্তাধারা ও আন্দোলনের লক্ষ্যগুলো তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত ফাতিমা জাহরা সালামুল্লাহি আলাইহার মর্যাদা প্রসঙ্গে বলেন, ‘নারী জাতির নেত্রী হযরত ফাতিমার আধ্যাত্মিক ও খোদায়ী মর্যাদা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে মানুষের বোধ ও চিন্তাশক্তি অক্ষম। এই মহিয়সী নারী মহানবী (সা)’র ইন্তেকালের পর অত্যন্ত কঠিন ও অবর্ণনীয় পরিস্থিতিতে আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ)’র অধিকারের প্রতি সমর্থন জানাতে মসজিদে আসেন এবং সত্যের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। অথচ এ সময় সাহাবিদের মধ্য থেকে গুটি কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছাড়া কেউই এই দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে সক্ষম হননি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এ প্রসঙ্গে আরও বলেছেন, একজন প্রকৃত দিশারীর ভূমিকা নিয়ে প্রকৃত ইসলামী নেতার পক্ষে হযরত ফাতিমা (সা.আ) যে মহান আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তার সঙ্গে অন্য কোনো ত্যাগের কোনো তুলনাই হয় না। আর এ জন্যই মহান আরেফ ও ফকিহ ইমাম খোমেনী (র) বলেছেন, হযরত ফাতিমা সিদ্দিকায়ে কোবরা যদি পুরুষ হতেন তাহলে তিনি নবী হতেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত ফাতিমা জাহরা (সা.আ)কে ইসলামের শ্রেষ্ঠ ও আদর্শ নারীর সর্বোচ্চ ও পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টান্ত তথা আদর্শ পথ-প্রদর্শক হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, এতোসব মহত্ত্ব ও মানুষের কল্পনাতীত উচ্চ-মর্যাদা সত্ত্বেও তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ও পেশা প্রসঙ্গে বলতে হয় যে, সেইসব অনন্য মর্যাদার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন আদর্শ মা, স্ত্রী ও একজন গৃহিনী।
আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী নারী বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে পাশ্চাত্যের ও তাদের কোনো কোনো অনুসারীর ত্রুটিপূর্ণ এবং অন্তঃসারশূন্য বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এইসব প্রতারিত উদাসীন ব্যক্তিরা নারীর গৃহিনী হওয়াকে উপহাস করেন। অথচ ঘর-সংসারের কাজ করার অর্থ হল মানুষকে প্রশিক্ষণ দেয়া ও বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি তথা মানুষকে জন্ম দেয়া। এটা সবচেয়ে বড় মর্যাদার বিষয়।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দৃষ্টিতে নারীর প্রতি সমর্থনের নামে কখনও কখনও তাকে দুর্বল করা হচ্ছে। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন: নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা বা তুলে ধরা ও পাশ্চাত্যে তাকে ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহারের সংস্কৃতি খুব সম্ভবত ইহুদিবাদী ষড়যন্ত্রেরই ফল। আর তারা এর মাধ্যমে মানবজাতিকে ধ্বংস করতে চায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কখনও কখনও ইরানের ভেতরেই ও এমনকি কোনো কোনো ইসলামী মহলেও নারী বিষয়ে এমন প্রত্যাশা ও দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয় যা বাস্তবে নারীকে হেয় ও তুচ্ছ করার শামিল।
নারী-পুরুষের খোদা-দত্ত কিছু কিছু মৌলিক মিল-অমিলের কথা তুলে ধরে আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, আধ্যাত্মিক মর্যাদায় আরোহণ, নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা ও মানুষকে পথ দেখানোর মত বিষয়গুলোতে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, কিন্তু জীবন পরিচালনার মত কোনো কোনো দায়িত্ব পালনের দিক থেকে তাদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আর হযরত ফাতিমা জাহরা (সা.আ)’র জীবনই এইসব বাস্তবতার দৃষ্টান্ত।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা পাশ্চাত্যে ‘লৈঙ্গিক ন্যায়বিচার’ ও ‘লিঙ্গ-ভারসাম্য’ প্রসঙ্গে বলেছেন, ন্যায়বিচারের অর্থ হল আল্লাহ-প্রদত্ত নানা যোগ্যতা বা প্রতিভাগুলোকে আবিষ্কার করে সেগুলোর বিকাশ ঘটানো।
তিনি এ প্রসঙ্গে আরও বলেছেন, আজ ‘লৈঙ্গিক ন্যায়বিচার’ ও ‘লিঙ্গ-ভারসাম্য’ প্রতিষ্ঠার সমর্থক পশ্চিমা চিন্তাবিদ এবং অন্য ব্যক্তিরা এ দুই বিষয়ের ফলে সৃষ্ট নানা অনাচার দেখে এসব বিষয়কে সমর্থন দেয়ার জন্য গভীরভাবে অনুতপ্ত। তাই আমি আশা করছি যারা ইরানের ভেতরে এ ধরনের ইস্যু নিয়ে কথা বলছেন তারা পশ্চিমাদের সেইসব ভুল ভাবধারাকেই সমর্থন করছেন না।
উইল ডুরান্টসহ পশ্চিমা অনেক চিন্তাবিদও নানা সময়ে স্বীকার করেছেন যে পাশ্চাত্যে পুঁজিবাদী শিল্প-বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট ব্যাপক উৎপাদনের ধারা এবং ব্যাপক উদ্বৃত্ত পণ্যের বাজার সৃষ্টির জন্যই নারীকে কল-কারখানায় ও শিল্পক্ষেত্রে টেনে আনা হয়েছে যাতে খুব সস্তায় নারীকে শ্রমিক হিসেবে শোষণ করা যায়। আর এ জন্যই নারীর সমান অধিকারের শ্লোগানকে ব্যবহার করেছে তারা এবং কথিত প্রগতিবাদী কিছু মহলসহ অনেক নারীবাদী আন্দোলনও তাদেরকে সমর্থন দিয়েছে এর মারাত্মক পরিণতির কথা না ভেবেই।
উইল ডুরান্ট বলেছেন, পাশ্চাত্যে নারীর এমন কোনো অধিকারই ১৯০০ সাল বা তার কাছাকাছি সময় পর্যন্ত ছিল না যা একজন পুরুষ মেনে চলতে বা তার প্রতি সম্মান দেখাতে বাধ্য হত। #