চাপে মোদি সরকার
নিট বিতর্কে উত্তাল ভারত: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে সংসদ থেকে রাজপথে তীব্র আন্দোলন
-
সংসদ ভবনের মকর দ্বারের সামনে বিক্ষোভ করেন বিরোধীদলের এমপিরা
ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (নিট-ইউজি ২০২৬)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকট এখন শুধু শিক্ষা খাতেই সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে সংসদ ভবনের প্রাঙ্গণেও। একদিকে বিরোধী দলগুলো শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সংসদে বিক্ষোভ করছে, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন এনডিএ সরকার বলছে, তারা এ বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রস্তুত। ফলে নিট ইস্যু এখন ভারতের জাতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
পদত্যাগের আগে কোনো আলোচনা নয়
বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে সংসদ ভবনে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নেতাদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত বিরোধী দলগুলো সরকারের সঙ্গে নিট ইস্যুতে কোনো আলোচনায় অংশ নেবে না।
কংগ্রেস নেতা কে.সি. বেনুগোপাল জানান, এই সিদ্ধান্ত লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, শিক্ষাব্যবস্থায় এত বড় অনিয়মের রাজনৈতিক দায় শিক্ষামন্ত্রীকে নিতে হবে।
অন্যদিকে সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, সরকার নিট ইস্যুতে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা করতে প্রস্তুত। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও অভিযোগ করেছে, বিরোধীরা বিতর্ক এড়িয়ে সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত করছে।
সংসদ চত্বরে মুখোমুখি শাসক ও বিরোধীরা
নিট ইস্যুকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার সংসদ ভবনের মকর দ্বারের সামনে বিক্ষোভ করেন কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, শিবসেনা (ইউবিটি) এবং অন্যান্য বিরোধী দলের এমপিরা। বিক্ষোভে অংশ নেন রাহুল গান্ধী, সোনিয়া গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। সাময়িক বরখাস্ত হওয়া তৃণমূল কংগ্রেসের এমপি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবির প্ল্যাকার্ড। তারা স্লোগান দেন, "জীবন বাঁচাও, নিট বন্ধ করো।"
এর পাল্টা কর্মসূচিতে অংশ নেন এনডিএ জোটের এমপিরা। তাদের স্লোগান ছিল, "যুবসমাজকে ঘাঁটিও না, রাহুল গান্ধী জেগে ওঠো।"
একপর্যায়ে দুই পক্ষের স্লোগান-পাল্টা স্লোগানে সংসদ চত্বরে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সিপিএমের এমপি জন ব্রিটাস ও বিজেপি নেতা অরুণ সিংহের মধ্যে পোস্টার নিয়ে টানাহেঁচড়ার ঘটনাও ঘটে। পরে সংসদের নিরাপত্তারক্ষীরা মানববেষ্টনী তৈরি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
মোদির প্রথম প্রতিক্রিয়া
দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর প্রথমবারের মতো নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস ইস্যুতে সরাসরি বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, দেশের তরুণদের ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকার ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিরোধীদের পাল্টা আক্রমণ
তবে, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় সন্তুষ্ট নয় আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটি মোদির পোস্ট পুনরায় শেয়ার করে মাত্র চারটি শব্দে প্রতিক্রিয়া জানায়, "ধর্মেন্দ্র প্রধান মাস্ট রিজাইন"।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপ প্রধানমন্ত্রী মোদির বক্তব্যকে ব্যঙ্গ করে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ছবি দিয়ে একটি মিম প্রকাশ করেন। সেখানে লেখা ছিল, "হাই, আমার নাম নাথিং (কিছুই নয়)।" এর মাধ্যমে তিনি মোদির "আমাদের তরুণদের কল্যাণ ও ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নয়" মন্তব্যকে কটাক্ষ করেন।
বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীও প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে বলেন, দেশের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকারের নীতির কারণে। তাঁর অভিযোগ, সরকার শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস হতে দিয়েছে এবং দায়ীদের রক্ষা করেছে।
আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে শিক্ষার্থীরা
গত ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি ২০২৬ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর পরীক্ষা বাতিল করা হয়। এরপর থেকেই দিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থী ও তরুণদের আন্দোলন চলছে।
সিজেপির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই জেন-জি আন্দোলনে কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি, শিবসেনা (ইউবিটি)সহ বিভিন্ন বিরোধী দল সমর্থন জানিয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন।
রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর
নিট বিতর্ক এখন শুধু একটি পরীক্ষা বা প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি মোদি সরকারের জবাবদিহি, শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং সংসদীয় রাজনীতির নতুন সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
সরকার একদিকে সংসদে আলোচনার আহ্বান জানাচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধীরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগকে আলোচনার পূর্বশর্ত হিসেবে তুলে ধরছে। ফলে সমঝোতার কোনো ইঙ্গিত এখনো দেখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় নিট ইস্যু ভারতের রাজনীতিতে আরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।#
পার্সটুডে/এমএআর/২৩
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।