চারজন গ্রেপ্তার, আইফোন উদ্ধার
কিশোর অপ্রতিম হত্যা: আইফোন ছিনিয়ে নিতেই হত্যাকাণ্ড- পুলিশের দাবি
-
পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে (১৩) আইফোন ছিনিয়ে নিতে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় তুহিন, ফাহাদ, কামরুল ও সিয়াম নামে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।
আজ (রোববার) দুপুর ২টা ১০ মিনিটে কুমিল্লা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান এসব তথ্য জানান। পুলিশ সুপার বলেন, "আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নিয়ে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে বাধা দিলে তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। পরে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করেন। একপর্যায়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত হলে আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান তারা।"
তিনি বলেন, "চাঞ্চল্যকর অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটন করতে আমরা জিডির ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করি। তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে আমরা নিশ্চিত হই যে, ১৮ সেপ্টেম্বর ২টা থেকে সোয়া ২টার দিকে তুহিন অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা নামক স্থানে চারপাশে পাহাড়ঘেরা নির্জন জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে অপ্রতিমের লাশ উদ্ধারের পর আমরা সিসিটিভি ফুটেজ দেখি ও পর্যালোচনা করি। এতে অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা তুহিনকে মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার আগেই আমরা হেফাজতে নেই।"
কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, "একটানা জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন আমাদের কাছে স্বীকার করে যে, অপ্রতীমের মোবাইল আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পনা করে সে তাকে ওই নির্জন ঘটনাস্থলে নিয়ে যায়। তুহিন আরও জানায়, এই ঘটনায় ফাহাদ এবং ফাহাদের এক বন্ধু জড়িত ছিল। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী আমরা তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান পরিচালনা করি এবং ফাহাদকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করি। জিজ্ঞাসাবাদে ফাহাদ জানায়, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার আরেক বন্ধু কামরুলও জড়িত। ফাহাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা কামরুলকে হেফাজতে নিই।"
পুলিশ সুপার বলেন, "তুহিনের দেওয়া তথ্য ও দেখানো মতে, প্রথমে সে আমাদের ভুল পথে পরিচালিত করেছিল। আইফোনটি উদ্ধারের জন্য আমরা তিন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করি। কোথাও না পাওয়ার পর অবশেষে তার স্বীকারোক্তি ও দেখানো মতে তার বাসায় অভিযান পরিচালনা করি। সেখানে তার দেখানো স্থান থেকে আইফোনটি আমরা উদ্ধার করতে সক্ষম হই।"
তিনি বলেন, "প্রাথমিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি, ঘটনার দিন বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে সানন্দা নামক স্থানে চারপাশে পাহাড়ঘেরা নির্জন বনের ভেতরে অপ্রতীমের আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে অপ্রতীম বাধা দেয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। এ সময় প্রথমে তুহিন এবং পরবর্তীতে ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে অপ্রতীমের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে। একপর্যায়ে অপ্রতীমের মৃত্যু নিশ্চিত হলে তুহিন অপ্রতীমের আইফোনটি নিয়ে ফাহাদ ও কামরুলসহ ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এ ছাড়া আমরা সিয়াম নামে আরেকজনকে আটক করেছি। তার বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করছি।"
জেলা পুলিশ সুপার বলেন, "আমরা ইতোমধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলকে এই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করেছি। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য বিষয় এবং অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে যাচ্ছি। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুতই পুলিশ প্রতিবেদন বা চার্জশিট বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করা হবে। আমরা বিজ্ঞ আদালতের কাছে আবেদন রাখব, লামিসা হত্যার মামলাটি যেমন দ্রুত রায় এসেছে, এই মামলাটিও যেন দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়।"
এর আগে রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজন সবাইকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি বলেন, নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার এবং এর পরবর্তী ১২ ঘণ্টার মধ্যে সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সর্বশেষ হিসাব মতে, আগে তিনজন, আজকে একজন—মোট চারজন গ্রেপ্তার হয়েছে এবং তারা অপরাধ স্বীকার করেছে।’ আইন অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি।
পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের সঙ্গে অভিযুক্তদের পরিচয় ও বন্ধুত্ব ছিল। তাদের বয়স অপ্রতিমের চেয়ে প্রায় ৫ থেকে ১০ বছর বেশি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তাদের কর্মকাণ্ড অনেকটা কিশোর অপরাধী চক্রের মতো।
গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম। এরপর সে আর বাসায় ফেরেনি। পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে নিখোঁজের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর শনিবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ময়নাতদন্ত শেষে রোববার তার দাফন সম্পন্ন হয়।#
পার্সটুডে/এমএএআর/২০